মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ চীন ইতিহাস মেনে নিতে বললো তাইওয়ান

বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের ওপর রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের ৩৭ বছর পূর্ণ হলো বৃহস্পতিবার। এই বিশেষ দিনে চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর করা মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বেইজিং। চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের মন্তব্য তাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কালিমালিপ্ত করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। অন্য দিকে, গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ান এই ঐতিহাসিক সত্য ও নির্মম ইতিহাসকে সরাসরি স্বীকার করে নেওয়ার জন্য চীনকে আহ্বান জানিয়েছে।

১৯৮৯ সালের ৪ জুন বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় তিয়ানআনমেন স্কয়ারে জড়ো হওয়া ছাত্র ও শ্রমিকের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমাতে চীনা সেনারা অতর্কিতে গুলি চালায়। চীনের অভ্যন্তরে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এই দিনটিকে সরকারিভাবেও স্মরণ করা হয় না।

Tiananmen anniversary 05
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, বেইজিংয়ের কঠোর সেন্সরশিপ বা তথ্য সেন্সর করার নীতি সামরিক অভিযানের সেই নির্মম স্মৃতিকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। তিনি আরও যোগ করেন, যারা নিজেদের বাকস্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অবিচ্ছেদ্য অধিকার রক্ষার জন্য সেদিন জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, একদিন তারা অবশ্যই সসম্মানে স্বীকৃতি পাবেন।

মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের এই বার্ষিক বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, আশির দশকের শেষের দিকে ঘটে যাওয়া ওই 'রাজনৈতিক অস্থিরতা'র বিষয়ে তাঁদের সরকার বহু আগেই একটি সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

রুবিওর বিবৃতির নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করছে এবং চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়ন যাত্রাকে কালিমালিপ্ত করছে, তাতে চীন তীব্রভাবে অসন্তুষ্ট এবং দৃঢ় বিরোধিতা করছে। মাও নিং অভিযোগ করেন, আমেরিকা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অজুহাতে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। সেসাথে তিনি বেইজিংয়ের চীনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতান্ত্রিক পথের পক্ষে সাফাই গান।

Tiananmen anniversary 02
তাইওয়ানের খোঁচা ও বেইজিংয়ের নীরবতা:
তিয়ানআনমেন স্কয়ারের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মরণে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে, বিশেষ করে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই-সহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রতি বছরই নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। তাইওয়ানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা প্রায়শই এই দিনটিকে বেইজিংয়ের কঠোর সমালোচনা করার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন, একটি সত্যিকারের মহান দেশের কখনোই সামরিক শক্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা উচিত নয় কিংবা সামরিক আগ্রাসনে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, আমি আন্তরিকভাবে আশা করি চীন ৩৭ বছর আগের ৪ জুনের ঘটনাটি সাহসের সাথে মোকাবিলা করবে, সত্যকে স্বীকার করবে, ইতিহাসের ক্ষত নিরাময় করবে এবং পারস্পরিক পুনর্মিলন ও সংলাপের পথ উন্মুক্ত করবে। তবে লাই চিং-তের এই মন্তব্যের বিষয়ে চীনের তাইওয়ান বিষয়ক দফতর থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। বেইজিং লাই চিং-থেকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে গণ্য করে এবং তাঁর আলোচনার সমস্ত প্রস্তাব বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

হংকংয়ে কড়াকড়ি ও বিশ্বজুড়ে আলোকশিখা: ১৯৮৯ সালের সেই কালো ভোরে চীনা ট্যাঙ্কগুলো তিয়ানআনমেন স্কয়ারে প্রবেশ করে ছাত্র ও শ্রমিকদের সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ পিষে দিয়েছিল। চীন সরকার এই ঘটনায় নিহতের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা সংখ্যা প্রকাশ করেনি, তবে মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এই সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে। চীন এই আন্দোলনের জন্য শাসক কমিউনিস্ট পার্টিকে উৎখাত করতে চাওয়া 'প্রতিক্রিয়াশীলদের' দায়ী করে থাকে।

Tiananmen anniversary 04
হংকংয়ের ভিক্টোরিয়া পার্কে এক সময় এই দিনটিতে দশ হাজারেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে ঐতিহাসিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু ২০২০ সালে বেইজিং সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করার পর এই জনসমাবেশ ও স্মরণসভা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

এখন সেই পার্কের ফুটবল মাঠগুলোকে বেইজিংপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উদ্যোগে টানা চতুর্থ বছরের মতো একটি আঞ্চলিক খাদ্য ও সাংস্কৃতিক মেলায় রূপান্তর করা হয়েছে। হংকংয়ে এখন যেকোনো ধরণের দৃশ্যমান স্মরণসভার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং শহরজুড়ে ভারী পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এরই মধ্যে, ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে একটি হলুদ ফুল হাতে হাজির হওয়ায় হংকংয়ের প্রবীণ গণতন্ত্রকামী কর্মী চান পো-ইং-কে পুলিশ ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক হওয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আজ ৪ জুন, একটি বিশেষ দিন যার অর্থ প্রত্যেকেই বোঝে।

এটা অত্যন্ত হাস্যকর যে একজন মানুষের হাতে মাত্র একটি ফুল দেখে সাংবাদিক এবং পুলিশদের এত বড় দল এখানে ছুটে এসেছে। এর কাছাকাছি অন্য একটি এলাকা থেকে মোমবাতি হাতে থাকা এক ব্যক্তিকে 'শৃঙ্খলভঙ্গ'-এর অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

Tiananmen anniversary 03
হংকংয়ে কড়াকড়ি থাকলেও বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে জার্মানিতে চারটি এবং অস্ট্রেলিয়ায় একটি বড় স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় চীনে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস সামাজিক মাধ্যম এক্সে কোনো ক্যাপশন ছাড়াই একটি ১৬ সেকেন্ডের অ্যানিমেশন ভিডিও পোস্ট করেছে। ভিডিওটিতে কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না, তবে সেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠেছিল কমিউনিস্ট সংগীত 'ল্য ইন্তেরনাসিওনাল', যা সে সময় আন্দোলনকারী ছাত্ররা ব্যাপকভাবে গেয়েছিলেন।

এছাড়া হংকংয়ে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট-জেনারেলও তাদের ফেসবুক পেজে একটি ছোট ভিডিও আপলোড করেছে, যেখানে মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো দিয়ে রোমান হরফে 'VIIV' (যার অর্থ জুন ৪) ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স