জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের ওই ৭.১ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর থেকে পুরো অঞ্চলজুড়ে ইতোমধ্যে ১০০টিরও বেশি 'আফটারশক' বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, জাপানে সাধারণত দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করার আগে প্রাথমিক প্রতিবেদনে যাদের 'কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট' হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তীব্র তাপদাহের মধ্যে কুমামোতো প্রশাসনিক অঞ্চলের একটি কাগজের কারখানা এবং একটি শপিং মলের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ভূমিকম্পের ১ ঘণ্টার মধ্যেই ওই শপিং মলটিতে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সময়ের সাথে যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। গৃহহীন হাজার হাজার মানুষকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং অঞ্চলটির বিশাল এলাকা এখনও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা বাসিন্দাদের আরও কিছুদিন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, আগামী এক সপ্তাহ, বিশেষ করে পরবর্তী দুই থেকে তিন দিন সর্বোচ্চ 'শিন্দো ৭' তীব্রতার ভূমিকম্প হতে পারে। তাই সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
শপিংমলে বিস্ফোরণ ও কাগজের কারখানায় আগুন: মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ১৬:২৭ মিনিটে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পটি কুমামোতো অঞ্চলে আঘাত হানে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল এর উৎসস্থল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম কাসিমা এলাকার 'ইয়ন মল'। কম্পনের পর মলটির দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ধসে পড়ে এবং ভবনজুড়ে আগুন ও বিস্ফোরণ ঘটে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মলটি থেকে সাদা ধোঁয়া বের হতে এবং ভীতসন্ত্রস্ত মানুষকে পার্কিং লটের দিকে ছুটতে দেখা যায়।
ইয়ন মলের প্রেসিডেন্ট আকিও ইয়োশিদা বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে শোক প্রকাশ করে জানান, বিস্ফোরণে মলটিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ তিনজনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ইয়াৎসুশিরো শহরের একটি কাগজের কারখানায় দুইজনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বিশাল উদ্ধার অভিযান ও দাবদাহের চ্যালেঞ্জ: প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, দুর্যোগ কবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪,৬০০-রও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে তাপমাত্রা প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছানোয় উদ্ধারকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্তদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি জানান, কুমামোতোর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিতরণের জন্য আকাশপথে প্রায় ৩০০টি এসি ইউনিট পাঠানো হচ্ছে।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় অঞ্চলটির রাস্তাঘাট ও ব্রিজে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে এবং অনেক ভবনে আগুন ধরে যায়। বেশ কয়েকটি স্থানে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯ শতকের বিখ্যাত 'ইয়াৎসুশিরো মন্দির' এর উপাসনালয় ধসে পড়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় বুলেট ট্রেন সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরবর্তী কয়েক দিন ধরে যে কোনো সময় শক্তিশালী আফটারশক হতে পারে। ফলে জাপানের উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের অতি সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি