জাপানের কিউশু দ্বীপে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে ৭.১ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল উকি শহরের হিকাওয়া শহরের কাছে, ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। এর ঠিক চার মিনিট পর, আতঙ্কিত বাসিন্দারা সামলে ওঠার আগেই একই স্থানে ৪.৫ মাত্রার একটি আফটারশক বা পরবর্তী মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। এই জোড়া ধাক্কায় অঞ্চলজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
জাপান ভূ-কম্পন পরিমাপের জন্য সাধারণ রিখটার স্কেলের পাশাপাশি নিজস্ব ‘শিন্দো’ স্কেল ব্যবহার করে, যা দিয়ে ভূ-কম্পনের তীব্রতা এবং মানুষ ও ভবনে তার প্রভাব কতটা শক্তিশালী তা নির্ধারণ করা হয়। মঙ্গলবারের এই ভূমিকম্পটি শিন্দো স্কেলের সর্বোচ্চ মাত্রা ‘শিন্দো ৭’ স্পর্শ করেছে, যা কুমামোতো শহর ও তার আশপাশের এলাকায় রেকর্ড করা হয়। এছাড়া নিকটবর্তী ইয়াৎসুশিরো, উতো এবং মাশিকি ও মিসাতো শহরে কম্পনের তীব্রতা ছিল ‘৬-আপার’।

এই শক্তিশালী কম্পন কেবল কিউশু দ্বীপে সীমাবদ্ধ ছিল না; বহুদূরের রাজধানী টোকিওতেও বহুতল ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। এমনকি সমুদ্রের ওপারে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান, গাওয়াংজু এবং জেওনাম অঞ্চলের বাসিন্দারাও ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
৬১টি আফটারশক: জাপানের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে যে, আজকের মূল ভূমিকম্পের পর মোট ৬১টি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব পরাঘাতের তীব্রতা ছিল ১ থেকে ৬-এর মধ্যে। তুলনামূলকভাবে বলা যায়, ২০১৬ সালে কুমামোতোয় যে ভূমিকম্পে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত এবং ৪০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছিল, সে সময় দু’দিন ধরে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপের স্কেল ছাড়াও জাপান নিজস্ব 'ভূমিকম্পের তীব্রতা' পরিমাপক স্কেল ব্যবহার করে।এই স্কেলে তীব্রতার মাত্রা শূন্য থেকে সাত পর্যন্ত হয়ে থাকে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার মতে, শূন্য মাত্রার অর্থ হলো মানুষ কোনো কম্পনই অনুভব করে না; অন্যদিকে সাত মাত্রার অর্থ হলো ভূমিকম্পের ফলে আসবাবপত্র সরে যায় বা ছিটকে পড়ে এবং ভূমিকম্প সহনক্ষমতা কম এমন ভবন ধসে পড়তে পারে।

জরুরি সুনামি সতর্কতা: ভূমিকম্পের পরপরই জাপানের আবহাওয়া সংস্থা আরিয়াকে ও ইয়াৎসুশিরো সাগরে সুনামি সতর্কতা জারি করে। ফুকুওকা, সাগা, নাগাসাকি এবং কুমামোতো উপকূলে ১ মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে অনবরত এই সতর্কবার্তা প্রচার করে এবং উপকূলীয় বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচুতে সরে যেতে ও ঘরের ভেতরে থাকা মানুষদের টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রায় ৯০ মিনিট পর অবশ্য এই সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
কাজের জায়গায় থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাটি এত তীব্রভাবে দুলছিল যে টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপ গড়িয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছিল। কর্মীরা সাহসিকতার সাথে সবাইকে টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে সাহায্য করেন এবং কম্পন থামার পর নিরাপদে বাইরে নিয়ে যান।

উৎপাদন স্তব্ধ, থমকে গেছে ট্রেন যোগাযোগ: ভূমিকম্পের প্রভাব অর্থনীতিতেও তাৎক্ষণিকভাবে পড়েছে। কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, শুরুর ধাক্কাতেই প্রায় ৪০,০০০ ঘরবাড়ি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জেআর কিউশু বুলেট ট্রেনসহ পুরো অঞ্চলের সব ধরনের রেল পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে, ফলে মাঝপথেই আটকে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী।
কিকুয়ো শহরে অবস্থিত চিপ প্রস্তুতকারক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি’র কারখানায় কম্পনের মাত্রা শিন্দো ৫ রেকর্ড করায় সতর্কতা হিসেবে সব কর্মী উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া ওই অঞ্চলে কারখানা পরিচালনাকারী ইলেক্ট্রনিক্স জায়ান্ট সনি’ও তাদের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করে কর্মীদের সরিয়ে নেয়।

শপিং মলে বিস্ফোরণ: শক্তিশালী ভূমিকম্প সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কুমামোতোর 'আয়ন মলে'। ভূমিকম্পের পরপরই বহুতল এই শপিং মলটিতে একটি বিকট বিস্ফোরণ ঘটে এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। পাশের এক রেস্তোরাঁ কর্মী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিস্ফোরণের শব্দ ও ধাক্কা এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন চারপাশে আগ্নেয়গিরির ছাই ঝরে পড়ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মলটির ভেতরে এখনো কয়েকজন আটকা পড়ে আছেন এবং তাদের উদ্ধারে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল কম গভীরে হওয়ায় আগামী এক সপ্তাহ জুড়ে শক্তিশালী আফটারশক এবং ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থিত হওয়ার কারণে বিশ্বে ঘটে যাওয়া ৬.০ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় ২০ শতাংশই জাপানে সংঘটিত হয়ে থাকে।

পেপার মিলে ধস: জাপানি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে’র বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, কুমামোতো প্রিফেকচারে একটি কাগজ কারখানার চিমনি ধসে পড়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, পুলিশ ও দমকল কর্মীরা কুমামোতো প্রিফেকচারের ইয়াতসুশিরো শহরে অবস্থিত ‘নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর ইয়াতসুশিরো কারখানায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত করছেন। রয়টার্স বার্তা সংস্থার হাতে আসা ঘটনাস্থলের একটি আকাশ থেকে তোলা ছবিতে একটি ভাঙা ও ধসে পড়া চিমনি দেখা যাচ্ছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল: কুমামোতো প্রিফেকচার ভূমিকম্পের জন্য নতুন কোনো জায়গা নয়; অতীতেও এখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।২০১৬ সালে এই অঞ্চলে ধারাবাহিক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। এর মধ্যে ছিল ১৪ এপ্রিল মাশিকি শহরে আঘাত হানা ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্প এবং ঠিক দুদিন পর একই এলাকায় আঘাত হানা ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্প।

জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে’র তথ্যমতে, কুমামোতো এবং পার্শ্ববর্তী ওইতা প্রিফেকচারে ওই ভূমিকম্পগুলোর কারণে ২৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার ধকল বা মানসিক চাপের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত সমস্যার জেরেও বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল।
এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জাপানের আবহাওয়া সংস্থার শিনজি কিয়োমোতো ২০১৬ সালের ঘটনার কথা উল্লেখ করে জনসাধারণকে পরবর্তী ভূমিকম্পের বিষয়ে ‘সতর্ক থাকার’ আহ্বান জানান।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-বিবিসি-ইকোনমিক টাইমস
