তালেবানি আফগানিস্তানে শিক্ষা বঞ্চিত ২৪ লাখ কিশোরী!

আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

চলতি সপ্তাহে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তীব্র উদ্বেগ সত্ত্বেও বেশ কিছু দেশ এই সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে।

ইউনেস্কো তাদের বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছে, বিশ্বের মধ্যে শুধু আফগানিস্তানেই নারী ও মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুরো জাতিকে দশকের পর দশক সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করা, চরম দারিদ্র্যকে আরও উসকে দেওয়া এবং এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।

Afgan Girl 03
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নারীশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ওপর এই দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞার ফলে ২০৬৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের কর্মক্ষেত্র থেকে আনুমানিক ৬ লাখ নারী হারিয়ে যাবে, যা অর্থনীতিতে প্রায় ৯৬০ কোটি মার্কিন ডলারের সামগ্রিক আয়ের ক্ষতি ঘটাবে। এর পাশাপাশি দেশে বাল্যবিয়ে ও অকাল বিয়ের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছিল যে নারীশিক্ষা আগের মতোই অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ২০২২ সালের মার্চ মাসে মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

তালেবান প্রশাসন এগুলোকে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দাবি করলেও তা কার্যকর রয়ে গেছে। শিক্ষায় বাধার পাশাপাশি নারীদের চাকরি ও অবাধ চলাচলের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যদিও তালেবান দাবি করে আসছে যে তারা ইসলামিক আইন ও আফগান সংস্কৃতি অনুযায়ী নারীদের অধিকার রক্ষা করছে।

উচ্চশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশে নারী শিক্ষকের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যা প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রকেও ধসের মুখে ফেলছে। বর্তমানে মেয়েদের ওপর নিষেধাজ্ঞার বাইরেও নানা কারণে দেশটির প্রায় ২০ লাখের বেশি প্রাথমিক শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে রয়েছে। ইউনেস্কোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে যোগ্য নারী শিক্ষকের ঘাটতি ১১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

Afgan Girl 02
জরুরি শিক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়ক হুদা জাবরিয়ান জানিয়েছেন, বহু যোগ্য শিক্ষক দেশ ত্যাগ করেছেন এবং যারা রয়ে গেছেন তাদের শিক্ষকতায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ছেলেদের স্কুলে নারী শিক্ষকদের পড়ানো নিষিদ্ধ করায় প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে অযোগ্য পুরুষ শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে, কিংবা অনেক স্কুলে কোনো শিক্ষকই পাওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে আফগানিস্তানের জাতীয় সাক্ষরতার হার মাত্র ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ১০ বছর বয়সী শিশুদের ৯০ শতাংশের বেশি একটি সাধারণ বাক্যও পড়তে অক্ষম। দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয় পর্যাপ্ত অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত এবং প্রায় অর্ধেক স্কুলেই সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন বা শীতকালীন উষ্ণতার সুব্যবস্থা নেই। তদুপরি, ২০২৫ সালেই জোরপূর্বক কিংবা স্বেচ্ছায় প্রায় ৩০ লাখ লোক আফগানিস্তানে ফিরে আসায় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

পাশাপাশি ২০২১ সালের পর থেকে ঘটে যাওয়া একাধিক ভূমিকম্প ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের অন্তত এক হাজার বিদ্যালয় স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থাকে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স