পারমাণবিক তরঙ্গও ঠেকাতে সক্ষম চীনা প্রেসিডেন্টের বিমান!

চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিংয়ের অফিশিয়াল রাষ্ট্রীয় বিমানটি কোনো সাধারণ আকাশযান নয়। এয়ার চায়না দ্বারা পরিচালিত এই রূপান্তরিত বোয়িং ৭৪৭-৮ ইন্টারকন্টিনেন্টাল মূলত চীন সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পরিবহন ও আকাশে ভাসমান এক মোবাইল কমান্ড সেন্টার।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রাজকীয় বিমানটি জীবনের শুরুতে একেবারেই সাধারণ এক বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান ছিল। ২০১৪ সালের শেষের দিকে এয়ার চায়নার বহরে যোগ দেয়ার পর ২০১৫ সালের মে মাসে এটিকে বাণিজ্যিক পরিষেবা থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেয়া হয়।

Xi Biman 3
এরপর টানা কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত গোপনে এবং সতর্কতার সাথে এটিকে রূপান্তর করা হয়। সংযোজন করা হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিলাসবহুল ভিভিআইপি ইন্টারিয়র। অবশেষে ২০১৬ সালের শরতে এটি চীনের প্রধান রাষ্ট্রীয় বিমান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশে উড়াল দেওয়া শুরু করে।

এই বিশেষ বিমানটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও স্পেসিফিকেশন যে কোনো আধুনিক যুদ্ধবিমানকেও টেক্কা দেয়ার মতো:

  • দৈর্ঘ্য: ৭৬.৪ মিটার
  • সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজন: প্রায় ৪,৪২,০০০ কেজি
  • ইঞ্জিন: চারটি জেনারেল ইলেকট্রিক টার্বোফ্যান ইঞ্জিন
  • সর্বোচ্চ গতি: ঘণ্টায় প্রায় ৯৮২ কিলোমিটার
  • ফ্লাইট রেঞ্জ: জ্বালানি না নিয়ে এক টানা প্রায় ১৪,৫০০ কিলোমিটার উড়তে সক্ষম।

নিরাপত্তার দিক থেকে বিমানটি যেন এক জ্যান্ত দুর্গ। এতে রয়েছে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ও সামরিক-গ্রেডের এনক্রিপ্ট করা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট শি বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে চীনের মূল সরকার ও সামরিক কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখতে পারেন।

Xi Biman 4
এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে শত্রুর হুমকি শনাক্তকরণের আধুনিক প্রযুক্তি, মিসাইল-ডিফেন্স কাউন্টারমেজার্স এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস শিল্ডিং। পারমাণবিক স্তরের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ থেকে বিমানের মূল সিস্টেম ও যোগাযোগ সরঞ্জামকে সুরক্ষিত রাখতেই এই ব্যবস্থা। ইএমপি শিল্ডিং হলো বিভিন্ন উপাদানের একটি বিশেষ সমন্বয় যা শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক শক্তির ধ্বংসাত্মক তরঙ্গকে ব্লক বা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়।

চীনের কঠোর নীতি অনুযায়ী, শুধু প্রেসিডেন্ট এবং স্টেট কাউন্সিল প্রিমিয়ারই এই রাজকীয় বিমানটি আন্তর্জাতিক সফরের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নেতারা চার্টার্ড বিমানে ভ্রমণ করেন, যেগুলো সফরের বাইরে সাধারণ যাত্রী পরিবহনেই ব্যবহৃত হয়।

অথচ এক সময় চীনের শীর্ষ নেতাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী বিশেষ বিমানই ছিল না! তৎকালীন কূটনৈতিক মিশনের প্রায় ২০ দিন আগে চীনের বিমান বাহিনী বাণিজ্যিক বোয়িং ৭৪৭-৪০০ বিমানে সাময়িকভাবে ভিভিআইপি ক্যাবিন, সোফা ও বিছানা ফিট করতো।

Xi Biman 2
মিশন শেষে সেটিকে আবার সাধারণ বিমানে রূপান্তর করা হতো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রোটোকল বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লু পেইশিনের মতে, প্রতি সফরের আগে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং সতর্কতার সাথে ক্রু নির্বাচনেই পুরো এক মাস কেটে যেত।

তবে চীনের নিজস্ব 'এয়ার ফোর্স ওয়ান' তৈরির ইতিহাসের পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ও চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা গল্প। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সান আন্তোনিও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষভাবে রূপান্তরিত একটি কাস্টমাইজড বিমান তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বেইজিংয়ে বিমানটি পৌঁছানোর পরপরই ঘটে বিপত্তি!

তল্লাশি চালিয়ে বিমানের ভেতরে লুকানো অবস্থায় অন্তত ২৭টি উচ্চপ্রযুক্তির আড়ি পাতার যন্ত্র (লিসেনিং ডিভাইস) উদ্ধার করা হয়। যদিও বেইজিং ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার বা অস্বীকার কোনটিই করেনি, তবে কয়েক মাস পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, চীনের ওপর আড়ি পাতা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সেই শিক্ষা থেকেই পরবর্তী সময়ে নিজেদের কঠোর তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত গোপনীয়তায় শি জিনপিংয়ের এই বর্তমান আকাশ-দুর্গটি নির্মাণ করে চীন।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি