ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলের যুদ্ধের ময়দান এখন যেন এক রক্তক্ষয়ী দাবার বোর্ড। ইউক্রেনের পূর্ব রণাঙ্গনে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর কাস্টিয়ানটিনিভকার একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে রুশ সেনা বাহিনী। ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কি জানিয়েছেন, রুশ সেনারা শহরটিতে ঢুকে পড়ার জন্য ক্রমাগত অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে দোনবাসের এই শক্তিশালী ‘দুর্গ’ রক্ষায় ইউক্রেনীয় বাহিনীও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে সেখানে তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র বিশ্লেষণকারী প্রজেক্ট ডিপস্টেটের তথ্য বলছে, রুশ সেনারা এখন কাস্টিয়ানটিনিভকার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। শহরের দক্ষিণ-পূর্বের কিছু অংশকে বর্তমানে ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অর্থ সেখানে কোনো পক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। রুশ জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ গত এপ্রিল থেকেই শহরটিকে উত্তর ও দক্ষিণ, উভয় দিক থেকে ঘিরে ফেলার যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে রণক্ষেত্রে।
ইউক্রেনীয় সেনাপ্রধান সিরস্কি টেলিগ্রামে এক বার্তায় জানান, গত সোমবার থেকে এই সেক্টরে রুশ বাহিনী অন্তত ৮৩ বার বড় ধরণের আক্রমণ চালিয়েছে। রুশরা এখন বড় দলের পরিবর্তে ছোট ছোট পদাতিক দল ব্যবহার করে শহরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শহরের ভেতর কড়া নজরদারি ও নাশকতাবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। সিরস্কির মতে, এপ্রিল মাস থেকে রুশদের এই হামলার তীব্রতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে মস্কো এখন দাবি করছে যে, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের সেসব এলাকা ছেড়ে দিতে হবে যা রাশিয়া এখনও দখল করতে পারেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা এই ইস্যুতেই স্থবির হয়ে পড়েছে। কিয়েভ সোজা জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এক ইঞ্চি জমিও তারা রাশিয়ার হাতে তুলে দেবে না। বড় কোনো শহর দখলে ব্যর্থ হয়ে রাশিয়া এখন ছোট ছোট গ্রাম ও জনপদ দখল করে নিজেদের সাফল্য দাবি করার কৌশল নিয়েছে।
এদিকে উত্তরের সুমি অঞ্চলেও সংঘাতের আগুন ছড়িয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা ‘মিরোপিলিয়া’ গ্রামটি দখল করেছে, তবে ইউক্রেনের ‘কুর্স্ক গ্রুপ’ এই দাবিকে ডাহা মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, এলাকাটি এখনও ইউক্রেনীয় বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সংঘাত থেমে নেই; সুমি অঞ্চলের ক্রোভলেটস শহরে রাশিয়ার বিমান হামলায় দুই জন গুরুতরসহ মোট ছয় জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দোনবাসের এই ‘দুর্গ বলয়’ বা ফোর্ট্রেস বেল্ট যদি শেষ পর্যন্ত রুশদের দখলে যায়, তবে তা হবে ইউক্রেনের জন্য এক বিশাল সামরিক বিপর্যয়। আপাতত কাস্টিয়ানটিনিভকার সেই ধূসর এলাকায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে শুধু কামানের গর্জন আর দুই বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। কিয়েভ কি পারবে তাদের এই দুর্গ রক্ষা করতে, নাকি রুশদের সেই ক্রমাগত ইঞ্চি ইঞ্চি এগিয়ে আসা কৌশলের কাছে হার মানবে দোনবাসের প্রতিরোধ? উত্তর দেবে সামনের দিনগুলো।
সূত্র: রয়টার্স