পুতিনের কণ্ঠে শান্তির সুর, যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত!

দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় আসার ইঙ্গিত দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি মন্তব্য করেন, আমার মনে হচ্ছে বিষয়টি (যুদ্ধ) শেষের দিকে চলে এসেছে।

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে ইউক্রেনে চূড়ান্ত বিজয়ের অঙ্গীকার করার পর পুতিনের এই সুর পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে আয়োজিত এবারের ৯ মে’র কুচকাওয়াজ ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে অনাড়ম্বর। রেড স্কয়ারে এবার আর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল বা বিশাল ট্যাঙ্কের সারি দেখা যায়নি। পরিবর্তে, ক্রেমলিনের দেওয়ালের বিশাল স্ক্রিনগুলোতে রুশ সামরিক সরঞ্জামের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। উল্লেখ্য, ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪১-৪৫) চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করে পুতিন একটি চমকপ্রদ এক নাম প্রস্তাব করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রয়েডারই তাঁর পছন্দের মধ্যস্থতাকারী। যেখানে ইউরোপীয় নেতারা পুতিনকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে দেখছেন, সেখানে শ্রয়েডারের মতো একজন পুরোনো বন্ধুর ওপর ভরসা রাখার কথা বলে পুতিন ইইউ নেতাদের মধ্যে বিভাজন তৈরির কৌশলী চাল চাললেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ও বন্দী বিনিময়

বর্তমান উত্তেজনার মাঝে কিছুটা স্বস্তির বাতাস এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর উদ্যোগে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত এক ত্রি-পক্ষীয় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে, যা মস্কো এবং কিয়েভ উভয় পক্ষই মেনে নিয়েছে। এই বিরতির অংশ হিসেবে ১,০০০ বন্দী বিনিময়েও রাজি হয়েছে দুই পক্ষ।

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি এই যুদ্ধ বন্ধ দেখতে চাই। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সেনার প্রাণহানি, এটি পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী করারও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শান্তি আলোচনা?

পুতিন এই যুদ্ধের জন্য পশ্চিমের ‘গ্লোবালিস্ট’ নেতাদের দায়ী করে বলেছেন, তারা বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর ন্যাটো সম্প্রসারণ না করার কথা দিলেও তা রাখেনি। অন্যদিকে, চার বছরের যুদ্ধে ইউক্রেনের বিশাল এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ, আর রাশিয়ার তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিও চরম চাপের মুখে।

যদিও রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, তবে দোনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখলে নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।


ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে পুতিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরেই শুধু এই বৈঠক সম্ভব। ইউরোপীয় কাউন্সিল প্রধান আন্তোনিও কস্তা রাশিয়ার সাথে আলোচনার কিছুটা সম্ভাবনা দেখলেও, অধিকাংশ ইউরোপীয় শক্তি এখনও পুতিনের পরাজয় নিশ্চিত করতেই অনড়।

পুতিনের ‘যুদ্ধ শেষের পথে’ মন্তব্য এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই ইউরোপের বুকে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের যবনিকা টানবে? নাকি এটি কোনো বড় সামরিক কৌশলের অংশ, তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী। তবে চার বছর পর এই প্রথম দুই পক্ষই অন্তত বন্দুকের নল নামিয়ে রাখতে এবং আলোচনার টেবিলে বসতে কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স