ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা, লেবাননে ভঙ্গুর পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকির মধ্যেই এক টেবিলে বসে ‘ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক’ অগ্রগতি অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি সোমবার ভোরে সফলভাবে শেষ হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চূড়ান্ত রোডম্যাপ তৈরিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ।

একই সাথে, ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননের মাটিতে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধের একটি বিশেষ মেকানিজম বা রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে দুই পক্ষ একটি সরাসরি যোগাযোগ লাইন চালু করতেও সম্মত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের ঐতিহাসিক বৈঠকটি শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের সই করা অন্তর্বর্তী চুক্তির ওপর ভিত্তি করে, যার লক্ষ্য ছিল গত এপ্রিল থেকে চলা সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে আরও অন্তত ৬০ দিন বর্ধিত করা। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রথম দফার এই আলোচনা সফলভাবে শেষ হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের বলেছেন ইরানের জনগণের সাথে সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে। লেবাননে সহিংসতা বন্ধের ক্ষেত্রেও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন মূল প্রতিনিধি দলটি তেহরানের উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ড ত্যাগ করলেও কারিগরি স্তরের আলোচনা চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই আলোচনার টেবিলে তেহরান তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা মওকুফ, অবরুদ্ধ বা ফ্রিজড আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়ে মার্কিন নিশ্চয়তা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
এই ইতিবাচক বার্তার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ঘাটতি নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমেছে এবং অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

রোববারের এই বৈঠকটি সোমবার ভোর পর্যন্ত গড়ালেও পর্দার আড়ালে ছিল তীব্র নাটকীয়তা। বৈঠক শুরুর ঠিক আগে ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধের চেষ্টা করে তবে তাদের কোনো দেশই থাকবে না। ট্রাম্প এমন ইঙ্গিতও দেন, দরকারে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল বা কর ধার্য করবে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের তথ্যমতে, ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইরানি প্রতিনিধি দল। তারা আলোচনার মূল টেবিলে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান শুরু করে। ইরানিদের স্পষ্ট দাবি, পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ছাড় এবং তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মওকুফের আইনি প্রক্রিয়া আগে কার্যকর করতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ইসরাইল তা লঙ্ঘন করছে, এমন অভিযোগ এনে শনিবার ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যেখানে ২৬টি জাহাজ এই প্রণালী পার হয়েছিল, সেখানে রোববার মাত্র ৫টি জাহাজ পারাপার করে।
লেবাননে কমছে সহিংসতার তীব্রতা: শনিবারের পর থেকে লেবাননের মাটিতে ইসরাইল-হিজবুল্লাহর সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছে। লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যার পর ইসরাইল কোনো বিমান হামলা চালায়নি, যা গত ২ মার্চের পর দীর্ঘতম সময় ধরে চলা এক আপেক্ষিক শান্তি। উত্তেজনা হ্রাসের ইঙ্গিত হিসেবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীও সোমবার সকাল ৬টা থেকে লেবানন সীমান্তের কাছাকাছি আটটি অঞ্চলের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর জারি করা নিরাপত্তা বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

লেবাননের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। এদিকে, ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের বিরোধী নয়, তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে অবশ্যই এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে ইরান চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি বা আঞ্চলিক প্রক্সি পালনের কাজে ব্যবহার করতে না পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
