সীমান্ত সুরক্ষায় জোরলো পদক্ষেপের ডাক দিলো ইইউ

মরক্কো থেকে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় হাজার হাজার অনিয়মিত অভিবাসীর আকস্মিক অনুপ্রবেশের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্ত সুরক্ষায় একতাবদ্ধ পদক্ষেপের তীব্র তাগিদ দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন।

সীমান্ত সংকটের জেরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা ও মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতির পর্যালোচনায় ইইউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি ভিডিও কনফারেন্স বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

স্পেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সেউতায় পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৬৯,৫০০ জন ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফিরে গেছেন, যা প্রাথমিক ধারণার (৫০,০০০) চেয়েও অনেক বেশি। সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে ৭২ জন এবং মরক্কোর দিকে ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

Ceuta migrant 03
সেউতা সীমান্তে এই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক মৈত্রী বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ইতাল স্পেনের সাথে 'শেঙ্গেন অঞ্চল' চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। উল্লেখ্য, শেঙ্গেন চুক্তির আওতায় ইউরোপের ২৯টি দেশের প্রায় ৪৫ কোটি নাগরিক কোনো প্রকার ভিসা বা সীমান্ত চেকপোস্ট ছাড়াই অবাধে যাতায়াত করে থাকেন।

ইতালির এই কঠোর পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। অন্যদিকে, চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিস ইইউ থেকে স্পেনের শেঙ্গেন সদস্যপদই সাময়িকভাবে বাতিল বা স্থগিত করার জোর দাবি তুলেছেন। এই ধরনের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের জবাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেন, ইউরোপের কিছু সরকারের এই অবস্থান ও আচরণ অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক কারণে সেউতা এমনিতেও শেঙ্গেন অঞ্চলের অংশ নয়। সানচেজের মতে, অধিকাংশ দেশ স্পেনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করলেও কিছু সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ, অজ্ঞতা, ভুয়া খবর ও পূর্বসংস্কারের বশবর্তী হয়ে স্পেনের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।

স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে দেওয়া এক চিঠিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় স্পেনের দ্রুত ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রমাণ করে, সংকটপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে আমাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা জরুরি।

Ceuta migrant 02
ফন ডের লেয়েন পুনর্ব্যক্ত করেন, ইইউ’র বাহ্যিক সীমান্ত রক্ষা করা কেবল কোনো একক দেশের দায়িত্ব নয়, বরং এটি সমগ্র ইউরোপের যৌথ দায়িত্ব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে ভৌত প্রতিবন্ধক বা সীমানা প্রাচীর নির্মাণের তাগিদ দেন তিনি।

অবৈধ অভিবাসন রোধে তিনি মূলত পাঁচটি বিশেষ ক্ষেত্রের ওপর জোর দিয়েছেন; এক- উৎস ও ট্রানজিট দেশগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে শুরুতেই অবৈধ যাত্রা রোধ করা। দুই- ইইউ’র বাহ্যিক সীমান্ত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। তিন- প্রারম্ভিক সতর্কবার্তা বা আগাম বার্তা পাওয়ার ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা। চার- মানব পাচারকারী ও চোরাচালানকারী চক্রগুলোর নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া। পাঁচ- অবৈধভাবে আসা ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর গতি ত্বরান্বিত করা।

এদিকে, স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানান, সেউতার পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। জলপথে অনিয়মিত অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা একটি বিশেষ ধরনের 'ইনফ্ল্যাটেবল ব্যারিয়ার' বা ভাসমান সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ করছেন। মানব পাচারকারীরা সাম্প্রতিক আদালতের রায় ও সুযোগের অপব্যবহার করে এই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছে মাদ্রিদ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি