রাজপ্রাসাদের বিলাসী জীবন, রাজমুকুট আর নরম গালিচার আরাম ছেড়ে ধুলোবালি ও কঠিন সামরিক বুটের জগতে পা রাখলেন ডেনমার্কের ১৯ বছর বয়সী রূপসী রাজকুমারী ইসাবেলা। কোনো লোক দেখানো আয়োজন নয়, একদম সাধারণের মতো নিজেই কালো রঙের এসইউভি হাঁকিয়ে গত ৩ আগস্ট স্লাগেলসে শহরের 'অ্যান্টভর্সকভ ব্যারাকে' পৌঁছে গেছেন তিনি। আর এর মাধ্যমেই ড্যানিশ রাজপরিবারের প্রথম নারী সদস্য হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে গড়লেন এক বিরল ইতিহাস।
ডেনমার্কের রাজা দশম ফ্রেডেরিক এবং রানী মেরির জ্যেষ্ঠ কন্যা রাজকুমারী ইসাবেলা হাইস্কুল শেষ করে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর পরপরই দেশের সেবায় নেমে পড়েছেন। 'গার্ড হুসার রেজিমেন্টে' যোগ দিয়ে তিনি পার করবেন টানা ১১ মাসের এক কঠিন সামরিক জীবন।
ব্যারাকে যোগ দেয়ার প্রথম দিনে তার গায়ে ছিল না রাজকীয় পোশাক কিংবা প্রোটোকলের চাকচিক্য। পরনে ঢিলেঢালা জিন্স আর সুয়েড জ্যাকেট, কাঁধে বিশালাকার এক ব্যাকপ্যাক আর হাতে ছোট একটি ব্যাগ ঝুলিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ান ব্যারাকের মূল ফটকে। ডিউটিতে থাকা সাধারণ নিরাপত্তারক্ষীকে নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন এই রাজকুমারী। সেখানে উপস্থিত হাতেগোনা কয়েকজন ফটোসাংবাদিকের দিকে স্মিত হেসে সম্ভাষণ জানিয়েই দ্রুত হারিয়ে যান ব্যারাকের অভ্যন্তরে।
ডেনমার্কের রাজপরিবারে সামরিক সেবার ঐতিহ্য বেশ পুরনো। তার বড় ভাই ক্রাউন প্রিন্স ক্রিশ্চিয়ানও এই একই ব্যারাকে তার প্রশিক্ষণ শেষ করে বর্তমানে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে ট্রেনিং নিচ্ছেন। তবে নারী হিসেবে ড্যানিশ রাজপরিবারে প্রথম বাধ্যতামূলক এই সক্রিয় সামরিক পরিষেবায় যোগ দিয়ে রাজকুমারী ইসাবেলা তৈরি করলেন নতুন মাইলফলক।
এই ঐতিহাসিক যাত্রার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, অন্যান্য সব রিক্রুটরা নিয়ম মেনে সরকারি বেতন ও দৈনিক ভাতা পেলেও, রাজকুমারী ইসাবেলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি সরকারের থেকে এক আনাও নেবেন না!
সাধারণত ডেনমার্কে ১১ মাসের সামরিক পরিষেবায় তরুণ-তরুণীদের একটি নির্দিষ্ট মাসিক বেতন এবং আয়করমুক্ত দৈনিক ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু রাজপরিবার থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ইসাবেলা স্বেচ্ছায় সব ধরণের বেতন ও ভাতা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই পুরো ১১ মাস নিজের খরচের জন্য তিনি শুধুই তার বাবা-মায়ের দেয়া পকেট মানির ওপর নির্ভর করবেন।
ইউরোপের বর্তমান অস্থির ভূ-রাজনীতি, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আর্টিকা অঞ্চলে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ডেনমার্ক সম্প্রতি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে। ২০২৪ সালে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করা হয় এবং সার্ভিসের সময়সীমা ৪ মাস থেকে বাড়িয়ে করা হয় ১১ মাস।
ইসাবেলার সাথেই এ সপ্তাহে প্রায় ১,৬০০ জন উঠতি তরুণ-তরুণী কঠোর এই সামরিক প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছেন। জানা গেছে, এর মধ্যে কিছু রিক্রুটকে প্রথমবারের মতো কৌশলগত অপারেশনের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডেও মোতায়েন করা হতে পারে। রাজপ্রাসাদের আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে এবার বরফ আর বন্দুকের লড়াইয়ে রাজকুমারী ইসাবেলা কতখানি মানিয়ে নিতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়!
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি