রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র ও বিধ্বংসী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। রোববার রাতে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি প্রধান বাজার আগুনে পুড়ে গেছে এবং ইস্পাত কারখানায় হামলায় দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্মরণকালের অন্যতম বৃহত্তম পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী হামলায় রাশিয়ায় সাতজন এবং ইউক্রেনে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক যুদ্ধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার'-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জাপোরিজিয়া ও দনেৎস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার ধীরগতির অগ্রগতির দাবিগুলো বেশ কিছুটা অতিরঞ্জিত। ইউক্রেনীয় বাহিনী ইতিমধ্যে পোকরোভস্ক ও স্লোভিয়ানস্কের দিকে নিজেদের অবস্থান শক্ত ধরে রেখেছে এবং বেশ কিছু এলাকা মুক্ত করার দাবি করেছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক জেলায় ভয়াবহ আগুনের সৃষ্টি হয়। মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকো ও আঞ্চলিক গভর্নর তৈমুর তকাচেনকো জানান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় কিয়েভে শিশুসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। রাজধানী কিয়েভের আক্রান্ত বাজারে আগুন ধরে কোটি কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বিবিসিকে জানান, আগুনে তাঁর প্রায় ৫ লাখ হ্রিভনিয়া (প্রায় ৮ হাজার ২৬২ পাউন্ড) মূল্যের পণ্যের পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
এ ছাড়া দেশটির সর্ববৃহৎ ইস্পাত কারখানা 'আর্সেলোরমিত্তাল ক্রিভি রিহ'-এ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ব্লাস্ট ফার্নেস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদনে ধস নেমেছে।
অন্যদিকে, মস্কোর গভর্নর আন্দ্রে ভোরোবিওভ জানিয়েছেন, মস্কো অভিমুখে ইউক্রেনের চালানো এই ড্রোন আক্রমণ ছিল সম্প্রতি দেখা সবচেয়ে বড় আঘাতের একটি। এই হামলায় মস্কোয় একজন ৮৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন এবং পোডলস্ক এলাকায় অনেকেই আহত হয়েছেন।
মস্কো থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রাশিয়ার সর্ববৃহৎ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর কোলেদিনো গুদামে ইউক্রেনীয় ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে। সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার এই বিখ্যাত ই-কমার্স নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে কয়েক সপ্তাহ ধরেই ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি উৎপাদন কারখানাতেও সফল হামলা চালিয়েছে। তা ছাড়া ইউক্রেন সীমান্তের কাছে বেলগোরোদ অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী বাসে ড্রোন হামলায় আরও একজন প্রাণ হারিয়েছেন।
ন্যাটো আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ: সংঘাতের আন্তর্জাতিক রেষ পৌঁছেছে ইউক্রেনের প্রতিবেশী রোমানিয়া পর্যন্ত। রোমানিয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, মলদোভা থেকে তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি ড্রোনকে ন্যাটোর দায়িত্বে থাকা স্প্যানিশ এফ-১৮ যুদ্ধবিমান দিয়ে সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে। চলতি বছরে ন্যাটোর আকাশসীমায় ড্রোন অনুপ্রবেশের এটি চতুর্থ ঘটনা। ন্যাটোর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভূপাতিত এই ড্রোনটি রাশিয়া থেকে ছিটকে এসে রোমানিয়ার জনমানবহীন এলাকায় পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়; বরং জ্বালানি শোধনাগার, সামরিক অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে উভয় দেশের এই সর্বাত্মক আক্রমণ গোটা অঞ্চলের জন্য আরও বড় সংকটের বার্তা দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-বিবিসি-সিএনএন