রাশিয়ার গ্যাস ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে যুক্তরাষ্ট্র!

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যেই নতুন করে বাণিজ্যিক মেরুকরণের জল্পনা শুরু হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা তথা মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা কিরিল মিত্রিভ গোপনে একাধিক বৈঠকে মিলিত হয়ে বিতর্কিত ‘নর্ড স্ট্রিম’ গ্যাস পাইপলাইনের মালিকানায় কোনো মার্কিন বিনিয়োগকারীকে যুক্ত করা যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে এই গোপন উদ্যেগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পাঁচটি সূত্র গোপন বৈঠকের খবর নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ সমাপ্তির পর রাশিয়া থেকে ইউরোপে প্রবাহিত জ্বালানি বিক্রি থেকে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিশ্চিত করতেই এই ছক কষা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Russia US Deal
মস্কো ও নিউ ইয়র্কে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জ্যারেড কুশনার এবং কিরিল মিত্রিভের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। মস্কো থেকে জার্মানিতে পুনরায় রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ শুরু করার জন্য লবিং করা মিত্রিভ গত মাসে মার্কিন জ্বালানি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যৌথ জ্বালানি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নর্ড স্ট্রিম নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো প্রত্যক্ষ আলোচনার খবর অস্বীকার করলেও জানিয়েছেন, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়াকে ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং এটি অবশ্যই মার্কিন করদাতা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।

তবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি খাদক দেশ জার্মানিতে রাশিয়া আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে কিনা তা নিয়ে বিপুল প্রশাসনিক বাঁধা রয়েছে। বর্তমানে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, ফলে এই পাইপলাইন পুনর্নবীকরণ করা আইনত অবৈধ।

 ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এ নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলেও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে আধিপত্য বিস্তার করলে তা কঠিন হয়ে পড়বে। তদুপরি, বার্লিন ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছে।

জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাশিয়া থেকে গ্যাস নেওয়ার আর কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই এবং জার্মানি ইতিমধ্যেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করে ফেলেছে।

Russia US Deal 2
নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনটির ৫১% মালিকানা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রমের হাতে, ৩১% দুটি জার্মান প্রতিষ্ঠানের এবং বাকি অংশ ফরাসি ও ডাচ কোম্পানির অধীনে রয়েছে। ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, রাশিয়া এই আলোচনার সুযোগ নিয়ে যুদ্ধ দ্রুত শেষ না করে নিজের ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করতে চাইছে।

ইউরোপীয় নীতি নির্ধারকদের মতে, এ ধরনের সমঝোতা রাশিয়াকে যুদ্ধের ময়দানে আরও শক্তিশালী করবে। ইউক্রেন আক্রমণের পর জার্মান জ্বালানি নীতির দায়িত্বে থাকা আইনপ্রণেতা মাইকেল কেলনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি একটি নোংরা চুক্তি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি, যার জন্য ইউরোপকে চড়া মূল্য দিতে হবে। আর এর সুফল ও মুনাফা ভাগ করে নেবে আমেরিকান এবং রাশিয়ানরা।

শুধু নর্ড স্ট্রিম নয়, রাশিয়ান জ্বালানি কোম্পানি ‘লুকঅয়েল’-এর অধীনে থাকা ইউরোপের বিভিন্ন তেল শোধনাগার ও পেট্রোল পাম্প কেনার বিষয় নিয়েও কুশনার ও মিত্রিভের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। মার্কিন ডিএফসি এবং কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি কনসোর্টিয়াম এগুলো কিনে নেবে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, এমন একটি ছক তৈরি করা হয়েছে। ইউক্রেনে সংঘাত জিইয়ে রেখে পর্দার আড়ালে রাশিয়া ও মার্কিন এই যৌথ জ্বালানি ব্যবসার ছক পুরো ইউরোপীয় ভূ-রাজনীতিকে চরম উত্তপ্ত ও দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স