জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নিতে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা হ্রাস করা এবং একটি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়ানো। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) আরাগচি লিখেছেন, আমি একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়ে জেনেভায় এসেছি। তবে, একটি বিষয় আলোচনার টেবিলে নেই, তা হলো হুমকির মুখে আত্মসমর্পণ।
চলতি মাসের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের কয়েক দশকের পুরনো পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে পুনরায় আলোচনা শুরু করে। অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারীরা যখন যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরীসহ অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে।
সোমবার আরাগচি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আরাগচি জানান, তাঁর বিশেষজ্ঞ দলটি একটি গভীর প্রযুক্তিগত আলোচনার প্রত্যাশা করছে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার শিকার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি চাইছে জাতিসংঘের এই পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা।
তবে তেহরানের দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকতে পারে, তাই এই নজিরবিহীন পরিদর্শনের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রটোকল প্রয়োজন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আসন্ন আলোচনায় আইএইএ ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করবে। তবে তিনি গ্রোসির সমালোচনা করে বলেন, পরিচালক হিসেবে গ্রোসি এনপিটি চুক্তির আওতায় সুরক্ষিত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলার নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেছেন।
আরাগচি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদির সঙ্গেও সাক্ষাতের কথা জানিয়েছেন। ওমান চলতি মাসের শুরুতে যুদ্ধের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিল। ইরান বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে, ওয়াশিংটনের ‘শূন্য পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ’ নীতিতে তারা রাজি হবে না এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি একটি ‘রেড লাইন’ যা নিয়ে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়াই হবে ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা’। জেনেভা আলোচনায় হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি হিসেবে ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারকে পাঠাতে পারেন। এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাস্কাট আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ব্র্যাড কুপার অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিনিধি দলে যোগ দিয়েছিলেন।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মাত্র এক মাস আগে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভে প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাকারীরা’ এই অস্থিরতার পেছনে ছিল। তবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে, যেখানে গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়।
তেহরানের কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আপস করার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সোমবার পার্লামেন্টের এক অধিবেশনে কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য হামিদ রাসায়ি নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানিকে সতর্ক করে বলেন, এনপিটির অধীনে বেসামরিক উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আগে আইএইএ’কে পরিদর্শনের সুযোগ দেয়া উচিত হবে না।
সুইজারল্যান্ডে চলমান অন্য একটি কূটনৈতিক তৎপরতায় রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চার বছর পূর্ণ হতে যাওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। গত শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, কিয়েভকে ‘অহরহ’ ছাড় দেয়ার কথা বলা হচ্ছে।