মার্কিন সামরিক বাহিনী এই সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে এই সশস্ত্র সংঘাতের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, ফাইটার জেট এবং রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফটের ব্যাপক সমাবেশের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের প্রস্তুতি গড়ে তোলা হয়েছে।
আমেরিকান গণমাধ্যম সিএনএন ও সিবিএস এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে। সিএনএন বলছে, হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়েছে যে, সামরিক বাহিনী হামলার জন্য প্রস্তুত, তবে ট্রাম্প এখনো দ্বিধাগ্রস্ত। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন এবং ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও মিত্রদের মতামত নিচ্ছেন। তবে সপ্তাহান্তের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি গত বছরও ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, বারবার তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। ২০১৮ সালে তাঁর প্রথম মেয়াদে বাতিল করা পারমাণবিক চুক্তির পরিবর্তে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে তিনি কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি: বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি বিমানবাহী রণতরি (ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন), নয়টি ডেস্ট্রয়ার এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ। এছাড়া ট্রাম্পের নির্দেশে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি 'ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড' আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একই সাথে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতি একটি বিরল ঘটনা।
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স এবং ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার টোয়েন্টিফোর অনুযায়ী, ট্রাম্প এই অঞ্চলে অত্যাধুনিক এফ-২২ র্যাপ্টর স্টেলথ ফাইটার, এফ-১৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধজাহাজের একটি বিশাল বহর পাঠিয়েছেন। বুধবার এই অঞ্চলে একাধিক কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট এবং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান চলাচল করতে দেখা গেছে।
হামলার নেপথ্যে ছয়টি প্রধান কারণ
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প কেন দ্রুত হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তার পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. পারমাণবিক চুক্তি: দীর্ঘদিনের এই বিরোধই প্রধান কারণ। জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, দুই পক্ষ এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে। ট্রাম্প কেবল নতুন চুক্তিই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে ইরানে 'শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন' চান বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
২. বিক্ষোভ দমন: ইরানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক হাজার হাজার বিক্ষোভকারী হত্যার ঘটনায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ। তিনি এর আগে বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছিলেন। যদিও গত মাসে তিনি হামলা থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন, তবে এখন পুনরায় হুমকি দিচ্ছেন।
৩. রণতরির কৌশলগত সংকেত: মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর মাধ্যমে ট্রাম্প এই বার্তাই দিচ্ছেন যে, দ্রুত কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে তিনি যুদ্ধের পথ বেছে নেবেন।
৪. ইসরাইলের চাপ: এক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইল সরকার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়াতে একমত হয়েছেন।
৫. তেল বাজারের পরিস্থিতি: বর্তমান বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত এবং দাম তুলনামূলক কম। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই মুহূর্তে ইরানে হামলা চালালে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামের প্রভাব হবে সীমিত ও সাময়িক।
৬. ইরানি শাসনের দুর্বলতা: খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকার বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং গত বছরের ইসরাইলি-মার্কিন হামলার কারণে কিছুটা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ধারণা, এখন হামলা চালালে ইরানের পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কম থাকবে।