যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু দেশটিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের উত্তেজনা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা, এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্যেই ইরান তার পরবর্তী নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে ইরানের রাজনীতি ও ধর্মের প্রধান নিয়ন্ত্রক খামেনি শনিবার ভোরে তেহরানের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত নিজ বাসভবনে হামলার শিকার হন। এই হামলায় তাঁর মেয়ে, দুই পুত্রবধূ, জামাতা এবং এক নাতিসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই সমন্বিত হামলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে দুশ’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের তৃতীয় দফার পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হওয়ার পরপরই এই সংঘাত চরম রূপ নেয়।
খামেনির মৃত্যুর পর এখন সবার নজর পরবর্তী নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকে। তাঁর দপ্তর থেকে রবিবার জানানো হয়েছে, নতুন উত্তরসূরি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেম যৌথভাবে সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের কার্যাবলি তদারকি করবেন।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভূমিকা
ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের মূল দায়িত্ব ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর ন্যস্ত। ৮৮ জন সিনিয়র ইসলামি আইনজ্ঞ ও আলেমদের নিয়ে গঠিত এই পরিষদ জনগণের ভোটে আট বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। নেতার মৃত্যু, পদত্যাগ বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে নতুন নেতা নিয়োগ দেওয়াই এদের প্রধান কাজ।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান মাত্র দুজন সর্বোচ্চ নেতাকে দেখেছে: প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী এবং ১৯৮৯ সালে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া আলী খামেনি।
সংবিধানের ১০৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নেতা নির্বাচনের পূর্ণ ক্ষমতা এই পরিষদের। এছাড়াও তারা নেতার কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণ এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাঁকে অপসারণের ক্ষমতাও রাখে। ২০২৪ সালে এই পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে এর প্রধান হিসেবে রয়েছেন প্রবীণ আলেম মোহাম্মদ আলী মোভাহেদি কেরমানি।
যেভাবে নির্বাচিত হন নতুন নেতা
যে কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীকে প্রথমে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়। ১৯৮৯ সালে খোমেনীর মৃত্যুর পর এক আবেগঘন পরিবেশে খামেনিকে নির্বাচিত করা হয়েছিল, যেখানে খোমেনীর ব্যক্তিগত সুপারিশ এবং পরিষদের ব্যাপক সমর্থন ছিল।
সাংবিধানিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই একজন যোগ্য ইসলামি আইনজ্ঞ, ন্যায়পরায়ণ, ধর্মপ্রাণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সুপণ্ডিত এবং সঠিক বিচার ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। যদি কোনো একক প্রার্থী সব যোগ্যতায় পূর্ণ না হন, তবে পরিষদ এমন একজনকে বেছে নিতে পারে যার নেতৃত্ব দেওয়ার শক্তিশালী ক্ষমতা ও রাজনৈতিক দক্ষতা রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও গোপনীয়তা
আনুষ্ঠানিক ভোটের আগে পরিষদ প্রার্থীর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। এসব বৈঠকের বিবরণ খুব কমই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা জানান, এই উত্তরাধিকার পরিকল্পনাটি আকস্মিক কোনো বিষয় নয়, বরং দীর্ঘ বছরের প্রস্তুতির ফসল। ১৯৮৯ সালে খামেনি ৭৪ ভোটের মধ্যে ৬০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তাঁকে এগিয়ে রেখেছিল।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা?
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৯ সালের মতো এখন এমন কোনো একক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নেই যাকে খামেনির বিকল্প হিসেবে সরাসরি দেখা যায়। বিদেশি গণমাধ্যমে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম আসলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, তিনি এই পদের দৌড়ে নেই। উল্লেখ্য, মোজতবার স্ত্রীও ওই হামলায় নিহত হয়েছেন, তবে হামলার সময় মোজতবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
অন্যান্য আলোচিত নামের মধ্যে খোমেনীর নাতি হাসান খোমেনীর নাম শোনা গেলেও তিনি বিবেচনায় নেই বলে জানা গেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে একসময় সম্ভাব্য উত্তরসূরি ভাবা হতো, কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু সেই সম্ভাবনাকে শেষ করে দিয়েছে।