যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে টানা পঞ্চম দিনেও ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তেহরান এসব দেশের মাটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি বেসামরিক এবং জ্বালানি অবকাঠামোতেও আঘাত হানছে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভ্রমণ, পর্যটন এবং অর্থব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তেল-গ্যাস শিল্পের মূলে আঘাত হানছে। এটি এমন এক যুদ্ধ যা আরব সরকারগুলো কখনোই চায়নি এবং তারা এটি প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি ইরানের এই ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ হামলার কারণে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, সব রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা ইতিপূর্বেই অতিক্রম করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর ক্রমাগত আঘাত আসছে। অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকাগুলোতে হামলা হচ্ছে এবং এসবের প্রভাব স্পষ্ট। পাল্টা জবাবের ক্ষেত্রে আমাদের নেতৃত্বের কাছে সব পথই খোলা আছে। আমাদের এটা পরিষ্কার করা দরকার, এ ধরনের হামলা বিনা জবাবে ছেড়ে দেয়া হবে না এবং ছেড়ে দেয়া সম্ভবও নয়।
অঞ্চলজুড়ে ইরানের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হচ্ছে, তবে ধ্বংসাবশেষের পতনে আগুন লাগছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে। ড্রোনগুলো প্রায়শই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে সামান্য ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও এগুলো বাণিজ্য ও ভ্রমণে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
মনে হচ্ছে এটিই ইরানের কৌশল, আরব প্রতিবেশীদের ওপর চাপ বাড়িয়ে তাদের বাধ্য করা যেন তারা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, ইরান ইসরাইলের মতো প্রায় সমপরিমাণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আমিরাতের ওপর নিক্ষেপ করেছে, যা এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র।
ইরান এই অঞ্চলের অত্যাবশ্যকীয় তেল ও গ্যাস শিল্পকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে সক্ষম। তবে তেহরানের এই কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। এই ঝুঁকি ইরানকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে, এমনকি তারা কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধপ্রক্রিয়ায় অংশও নিতে পারে।
এখন পর্যন্ত তারা ইরানের ওপর হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবে এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। কোনো এক পর্যায়ে তারা সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও নিতে পারে। আরব দেশগুলো এখনই সেই পথে হাঁটছে না, আপাতত তারা আত্মরক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তবে অনেক কিছুই নির্ভর করছে এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তার ওপর।
অনেকেই এই যুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে গাজায় ইসরাইলের প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক অভিযান এবং লেবানন ও সিরিয়ায় তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ আরবদের সাথে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটিয়েছে। বিশেষ করে গত বছর হামাস নেতৃত্বকে হত্যার উদ্দেশ্যে কাতারজুড়ে ইসরাইলি বোমা হামলার ঘটনায় তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরানের এই হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য আরও সুদৃঢ় করেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয়টি সদস্য দেশ- সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান, রোববার এক জরুরি অধিবেশনে মিলিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা তাদের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং ভূখণ্ড রক্ষায় ‘আগ্রাসনের জবাব দেয়ার বিকল্পসহ’ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানকে হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, আপনার যুদ্ধ আপনার প্রতিবেশীদের সাথে নয়। নিজের পরিবেশে ফিরে আসুন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করুন; বিচ্ছিন্নতা এবং উত্তেজনার বৃত্ত বড় হওয়ার আগেই সচেতন হোন।
সূত্র: বিবিসি