ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধের গভীরে। সম্প্রতি অনলাইনে ভাইরাল হওয়া এক চাঞ্চল্যকর দাবি অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের ব্যক্তিগত বাসভবনে আঘাত হেনেছে।
তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও সংশয়। এই জল্পনার মূলে রয়েছেন মার্কিন মেরিন কোরের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটার। একটি অনলাইন টকশোতে তিনি দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নেতানিয়াহু ও বেন-গভীরের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। রিটার আরও অভিযোগ করেন, এই হামলায় নেতানিয়াহুর ভাই ইদ্দো নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন এবং মন্ত্রী বেন-গভীর গুরুতর আহত হয়েছেন। তার মতে, ইরানের এই আক্রমণ ইসরাইল ও আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ‘অন্ধ ও বধির’ করে দিয়েছে।
রিটারের এই বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ফোরামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বেন-গভীরের সাম্প্রতিক একটি গাড়ি দুর্ঘটনাকে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর ধামাচাপা দেয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকী ও কৌশলগত দিক থেকে ইরানের কাছে নেতানিয়াহু ও বেন-গভীরের বাসভবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু। এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক নেতাদের মৃত্যুর পর ইরান বিপর্যস্ত। এর পাল্টা দিতে তারা ইসরাইলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানতে চায়।
ইসরাইলের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা ইরানের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। সেই সঙ্গে এটি প্রমাণ করা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে যে কোনো স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম।
এখন পর্যন্ত ইসরাইল বা ইরান, কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এ হামলার খবর নিশ্চিত করেনি। ইসরাইলে বর্তমানে কঠোর সামরিক সেন্সরশিপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর আওতায় যে কোনো স্পর্শকাতর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য বা ক্ষয়ক্ষতির খবর প্রকাশের আগে সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের সেন্সরশিপ অনেক সময় তথ্যের শূন্যতা তৈরি করে, যা সামাজিক মাধ্যমে জল্পনা আর গুজব ছড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, সত্যটি চাপা দেয়ার চেষ্টা অনেক সময় আরও বড় গুজবের জন্ম দেয়।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান এখন পর্যন্ত মূলত ইসরাইলের সামরিক অবকাঠামো ও বিমানঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের বাসভবনে হামলা চালানো একটি চরম উস্কানি হিসেবে গণ্য হয়, যা যুদ্ধের সংজ্ঞাকেই বদলে দিতে পারে। তাই এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহু বা বেন-গভীরের বাড়িতে হামলার দাবিটিকে রণক্ষেত্রের বাস্তব ঘটনার চেয়ে 'তথ্যযুদ্ধের কৌশল' হিসেবেই বেশি দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি ভুল তথ্য বা অতিরঞ্জিত দাবিও রকেট বা কামানের গোলার চেয়ে বেশি বিধ্বংসী হতে পারে। স্কট রিটারের দাবি যদি সত্য প্রমাণিত না হয়, তবে এটি কেবল যুদ্ধের ধোঁয়াশা বৃদ্ধি করবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবে।