মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন মিসাইল আর যুদ্ধবিমানের গর্জনে প্রকম্পিত। বুধবার যুদ্ধের ১২তম দিনে পা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরান একে অপরের ওপর স্মরণকালের ভয়াবহতম হামলা চালিয়েছে। একদিকে যখন সীমান্তজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে তেহরান নিজ দেশের ভেতরে সম্ভাব্য সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘ট্রিগারে আঙুল’ দিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতভর চলা পাল্টাপাল্টি হামলার পর বুধবারও ইসরাইল, লেবানন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আক্রমণের তীব্রতা কমেনি।
মঙ্গলবার রাতে ইরান থেকে ছোঁড়া মিসাইলের ঝঁক ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বোম্ব শেল্টারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। যদিও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক মিসাইল রুখে দিয়েছে, তবে এই হামলা প্রমাণ করে, ১২ দিনের যুদ্ধের পরও ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতা ফুরিয়ে যায়নি। অন্যদিকে, বৈরুতে হিজবুল্লাহর আস্তানাগুলো লক্ষ্য করে নতুন করে শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরানে প্রায় ১,৩০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ৮,০০০-এর বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলে অন্তত ১১ জন এবং লেবাননে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১৪০ জন সেনা আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত অচল। বুধবার হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে আগুন ধরে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত উপকূলের কাছে আরও একটি কন্টেইনার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার তেলের দাম আকাশচুম্বী হলেও মঙ্গলবার থেকে তা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত এই যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজবেন। এদিকে, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ইতিহাসের সব থেকে বড় ‘অয়েল রিজার্ভ’ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনেইর সমর্থনে ইরানে বিশাল র্যালি অনুষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের আশায় বুক বাঁধছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানানোর পর তেহরান প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদরেজা রাদান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শত্রুর প্ররোচনায় যারা রাস্তায় নামবে, তাদের বিক্ষোভকারী নয় বরং 'শত্রু' হিসেবে গণ্য করা হবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যেকের আঙুল এখন বন্দুকের ট্রিগারে। শত্রু দেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরান ইতিমধ্যেই একজন বিদেশি নাগরিকসহ কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।
ইরানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আবুল ফজল শেকারচি অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো ইরানকে জানিয়ে দেয়। তার দাবি, এতে করে বেসামরিক মানুষের ক্ষতি এড়িয়ে নির্ভুলভাবে শত্রুর ওপর আঘাত হানা সম্ভব হবে।
বুধবার দুপুরে তেহরানে যুদ্ধের শুরুতে নিহত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একদিকে শোক আর অন্যদিকে যুদ্ধের দামামা, সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য।