ইরানের উপকূলবর্তী সংকীর্ণ জলপথে তেহরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলায় উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ধসে পড়লেও, ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় স্বাভাবিক গতিতেই অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্সের একটি ট্যাঙ্কার ট্র্যাকিং ডেটা পর্যালোচনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি 'ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স ডটকম'-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর থেকে দেশটি প্রায় এক কোটি ৩৭ লক্ষ ব্যারেল ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এই কোম্পানিটি মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দেশগুলোর তেল ও গ্যাস পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া জাহাজ বহরের গতিবিধি শনাক্ত করে থাকে। অন্যদিকে, ভেসেল ট্র্যাকিং পরিষেবা 'কেপলার' এর হিসাবমতে, মার্চের প্রথম ১১ দিনে ইরানের রপ্তানির পরিমাণ আরও বেশি, প্রায় এক কোটি ৬৫ লক্ষ ব্যারেল।
ইসরাইল ও মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা শুরু করেছে। এর ফলে ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারীরা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকানোর ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য মার্কিন হস্তক্ষেপ বা জাহাজ জব্দের ঘটনা না ঘটা অনেকটা বিস্ময়কর। এর আগে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় দেশটিকে নৌ-অবরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং জলসীমায় প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় বহু জাহাজ জব্দ করা হয়েছিল। ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসেসের পরিচালক ডেভিড টানেনবাম বলেন, গত ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো সফলভাবে জব্দ করার পর আমি অবাক হয়েছি যে, যুক্তরাষ্ট্র কেন এই সংঘাতের আগে বা বর্তমানে ইরানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে জাহাজ ও নৌ-বিশেষজ্ঞ মাতিয়াস টোনি মনে করেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলো থামানোর চেষ্টা করলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর আরও বড় ধরনের হামলা শুরু হতে পারে। শিপিং ফাইন্যান্সিয়ার জেমস লাইটবোর্ন বলেন, যতদিন ইরান এই অঞ্চলে নিজেদের জাহাজ সচল রাখতে পারছে, ততদিন তারা হরমুজ প্রণালী অন্তত কিছুটা হলেও উন্মুক্ত রাখতে চাইবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ট্যাঙ্কার জব্দ করা শুরু করে, তবে মাইন পেতে পুরো প্রণালীটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে ইরান দ্বিধা করবে না।
রপ্তানির গতি গত বছরের মতোই স্বাভাবিক
ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স এবং কেপলারের তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চের মধ্যে ইরান প্রতিদিন গড়ে ১১ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। গত বছর দেশটির গড় দৈনিক রপ্তানি ছিল ১৬.৯ লক্ষ ব্যারেল। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানের 'খার্গ আইল্যান্ড' রপ্তানি কেন্দ্রে এখনও বেশ কিছু বিশালাকার তেলবাহী জাহাজ তেল লোড করছে, যা নির্দেশ করে যে আগামী দিনগুলোতে রপ্তানির গতি আরও বাড়তে পারে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হামলার আশঙ্কায় ফেব্রুয়ারি মাসেই ইরান তাদের রপ্তানি বাড়িয়ে দৈনিক ২১.৭ লক্ষ ব্যারেলে উন্নীত করেছিল। এমনকি ১৬ ফেব্রুয়ারি সমাপ্ত সপ্তাহে দেশটি রেকর্ড ৩৭.৯ লক্ষ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে অন্তত ছয়টি তেলের ট্যাঙ্কার ইরান ছেড়েছে, যার মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা 'কুমা' নামক জাহাজটিও রয়েছে। এছাড়া গত শুক্রবার আরও দুটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস ট্যাঙ্কার কার্গো নিয়ে ইরান ত্যাগ করেছে। শিপিং সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব জাহাজ মূলত ইরানের ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ এবং তাদের ১২ নটিক্যাল মাইল জলসীমার ভেতর দিয়ে চলাচল করছে, যা তাদের এক ধরনের সুরক্ষা কবচ দিচ্ছে।