বাবার মৃত্যুর পর অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন ইরানের নবনিযুক্ত সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি। তবে সশরীরে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একজন সংবাদ উপস্থাপকের মাধ্যমে নিজের প্রথম বার্তা পৌঁছে দিলেন তিনি। রোববারে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই অন্তরালে থাকা এই নেতার প্রথম বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে কড়া হুঁশিয়ারি- যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মাটি ‘উত্তপ্ত’ রাখার শপথ নিয়েছেন তিনি।
মোজতবা খামেনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মোজতবার বার্তায় বলা হয়, এই অঞ্চলে সব মার্কিন ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় সেগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও দাবি করেন, এই যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ শত্রুপক্ষকে দিতে হবে। আর যদি তারা রাজি না হয়, তবে ইরান নিজ হাতে সেই সম্পদ কেড়ে নেবে অথবা ধ্বংস করে দেবে।
মোজতবা কেন ক্যামেরার সামনে আসছেন না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে কানাঘুষো। সিএনএন এবং দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়েছেন।
সাইপ্রাসে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আলিরেজা সালারিয়ান জানিয়েছেন, যে হামলায় তাঁর বাবা আলী খামেনেই এবং পরিবারের অন্য পাঁচ সদস্য নিহত হন, সেই একই হামলায় মোজতবার পা ভেঙেছে এবং তিনি শরীরের আরও কিছু জায়গায় আঘাত পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি সুরক্ষিত গোপন আস্তানায় চিকিৎসাধীন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মোজতবা খামেনির অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে একটি ছবি প্রকাশ করেছে, যা তাঁর নিজের হাতে লেখা বলে দাবি করা হচ্ছে। সেখানে তিনি ক্রমান্বয়ে রুহুল্লাহ খোমেনি, আলী খামেনা এবং নিজের নাম লিখেছেন। তালিকার নিচে পবিত্র কোরআনের সূচনাবাক্য- ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ (পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি) লেখা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাঁর শাসনের এক ‘নতুন এবং কঠোর’ সূচনার ইঙ্গিত। প্রতিবেশীদের প্রতি ‘বন্ধুত্ব’ আর আমেরিকার প্রতি ‘আগুন’ মোজতবা খামেনি বক্তব্যে অদ্ভুত এক দ্বিমুখী নীতি লক্ষ্য করা গেছে:
প্রতিবেশীদের জন্য বার্তা: তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন এবং লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রক্সি যুদ্ধ: ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরানকে সাহায্য করতে ‘উন্মুখ’ হয়ে আছে বলে তিনি গর্বভরে উল্লেখ করেছেন।
সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ: কঠিন সময়ে ইরানকে বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি দেশের সবগুলো সেনা ইউনিটের বীর যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে মোজতবা এখন পুরোপুরি মারমুখী। একদিকে প্রতিবেশীদের পাশে টানার চেষ্টা, অন্যদিকে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলার হুমকি, সব মিলিয়ে মোজতবা খামেনির প্রথম বার্তাই বলে দিচ্ছে, ইরান পিছু হটার পাত্র নয়। আত্মগোপনে থাকা এই নেতার একটি নির্দেশেই এখন কাঁপছে পারস্য উপসাগরের তেলের বাজার। পরিস্থিতি এখন কোন দিকে গড়ায় সেটিই দেখার বিষয়।