ইরানের সামরিক অন্দরমহল: টিকে থাকার লড়াইয়ে এক ভয়ঙ্কর রহস্য

ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো প্রথাগত বা সম্মুখ যুদ্ধে জেতার জন্য গঠিত হয়নি। বরং এটি তৈরি করা হয়েছে টিকে থাকার জন্য, হামলা সয়ে নেয়ার জন্য এবং দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ইরানের প্রতিটি বাহিনীকে। প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে এমন কথাই জানিয়েছে দেশটির সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

কয়েক সপ্তাহের টানা মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর ইরানের বাহিনীর গঠন ও বর্তমান কর্মকাণ্ডে সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গেলো ২৩ মার্চ মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের একটি তথ্যপত্র অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৯,০০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। ৯,০০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান অভিযান চালিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র সাইট, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্র উৎপাদন কারখানায় হামলা চালিয়েছে।


মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত মার্চের এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নির্মূল করছি, ইরানি নৌবাহিনীকে ধ্বংস করছি এবং ইরান যাতে দ্রুত এগুলো পুনর্গঠন করতে না পারে তা নিশ্চিত করছি।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্রকৃত চিত্রটি আরও জটিল। থিংক ট্যাঙ্ক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ফেলো নিকোলাস কার্ল ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, বিষয়টি মিশ্র। এক দিকে ইরানের সামরিক শক্তি সব দিক থেকেই ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা এখনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রেখেছে।


শাসন রক্ষায় গঠিত দ্বৈত সেনাবাহিনী

ইরানের সামরিক ব্যবস্থার মূলে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত দ্বৈত কাঠামো; প্রথাগত সেনাবাহিনী বা 'আর্তেশ' এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসি মূলত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য একটি সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে গঠিত হয়েছিল।

কার্লের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে একটি কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য ঘিরেই এই সশস্ত্র বাহিনীকে গড়ে তুলেছেন; ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষা করা এবং বিপ্লবী আদর্শ রপ্তানি করা। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ জানান, আইআরজিসি বরাবরই অগ্রাধিকার পায়। বিশেষ করে বেশি বাজেট, উন্নত বেতন এবং অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সবই তারা পায়।


ক্ষেপণাস্ত্রই ইরানের প্রধান শক্তি

ব্যাপক হামলার পরও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিই ইরানের সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে আছে। আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় এই সক্ষমতা অনেক কমেছে। জেনারেল কেইন জানান, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার হার ৮৬ শতাংশ এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ ৭৩ শতাংশ কমেছে।

যুদ্ধ বিষয়ক সচিব পিট হেগসেথ বলেন, এই অভিযান ইরানের নিরবচ্ছিন্ন হামলার ক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, হুমকি এখনো বিদ্যমান এবং ইরান এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম। নিকোলাস কার্লের মতে, ইরানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনো সচল আছে এবং তারা ২,০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে।


বিশ্ব বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করতে নৌবাহিনী

পেন্টাগনের দাবি, তারা ইরানের নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে বড় সাফল্য পেয়েছে। ১৪০টিরও বেশি ইরানি জলযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের নৌ-হুমকি কখনোই বড় জাহাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আইআরজিসির নৌবাহিনী মূলত ছোট দ্রুতগামী যান (স্পিডবোট), মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সমন্বয়ে গঠিত, যা শত্রুকে ব্যতিব্যস্ত করতে এবং সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ করতে ডিজাইন করা হয়েছে। সিট্রিনোভিজ বলেন, তাদের এখনো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে।

আকাশপথ ও স্থল বাহিনীর অবস্থা

মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানি আকাশসীমায় আধিপত্যের দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান কখনোই আকাশপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের বিমান বাহিনী পুরনো বিমানের ওপর নির্ভরশীল। এর পরিবর্তে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর বেশি জোর দেয়।


অন্যদিকে, ইরানের স্থল বাহিনী এখনো অনেকটা অক্ষত। আর্তেশের কয়েকটি ব্রিগেড মূলত সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত। সিট্রিনোভিজ বলেন, স্থলবাহিনী এখনো অটুট আছে, কারণ কেউ ইরানে আক্রমণ (ইনভেশন) করেনি। সেনা সংখ্যার দিক থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের যে কোন দেশের চেয়ে এগিয়ে ইরান।

প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার

সীমানার বাইরেও আইআরজিসির কুদস ফোর্সের মাধ্যমে ইরান তার প্রভাব বজায় রাখে। হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ, অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ইরান একটি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক স্বার্থ বিঘ্নিত করতে পারে।


জেতার জন্য নয়, টিকে থাকার জন্য

ইরানের সামরিক বাহিনী মূলত অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবিলা এবং শাসন ব্যবস্থার টিকে থাকা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত। এমনকি কয়েক সপ্তাহের টানা হামলার পরও ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে বাধা এবং প্রক্সি বাহিনী ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে। এটি হয়তো দুর্বল হয়েছে, কিন্তু কৌশলগতভাবে এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কার্লের ভাষায়, ইরানি সামরিক বাহিনীর হুমকিকে আমরা ছোট করে দেখতে পারি না; এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।