ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে স্তব্ধ করতে এক দুঃসাহসিক ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরান থেকে প্রায় ১,০০০ পাউন্ড (৪৫৩.৫ কেজি) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করে নিয়ে আসার জন্য বিশেষ কমান্ডো বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা হোয়াইট হাউসের টেবিলে রয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানের অনুমোদন দিলে মার্কিন সেনাকে দিনের পর দিন, এমনকি সপ্তাহজুড়ে ইরানের ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থান করতে হতে পারে। ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট, যে কোনো মূল্যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। রোববার রাতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওরা (ইরান) আমাদের পারমাণবিক ধুলো দিয়ে দেবে, নতুবা ওদের কোনো দেশই থাকবে না। ট্রাম্প এই অপারেশনের নাম দিয়েছেন অপারেশন 'ইউরেনিয়াম এক্সট্রাকশন'।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ মূলত দুটি জায়গায় রয়েছে: ইসফাহানের একটি ভূগর্ভস্থ টানেল এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে। গত বছরের জুনে ইসরাইল-মার্কিন বিমান হামলার পরও ইরান এই বিশাল পরিমাণ ইউরেনিয়াম রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসফাহানের পাহাড়ের গভীরে এই বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ রাখা হয়েছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই সম্ভাব্য অপারেশনকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে জটিল মিশন হিসেবে দেখছেন। এর কারণগুলো হলো- মার্কিন সেনাদের ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং মিসাইল হামলার মুখে সেখানে নামতে হবে। ইউরেনিয়াম মজুদের চারপাশ ধ্বংসাবশেষ, ল্যান্ডমাইন এবং ‘বুবি ট্র্যাপ’ দিয়ে ঘেরা থাকতে পারে। যা মার্কিন কমান্ডোদের বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
ইরানের এই ইউরেনিয়াম ৪০ থেকে ৫০টি বিশেষ সিলিন্ডারে রাখা আছে। এগুলো সরিয়ে নিতে বেশ ভারী যানবাহন এবং বিশেষ সুরক্ষামূলক আবরণের প্রয়োজন হবে। এটি কোনো ‘কুইক ইন অ্যান্ড আউট’ অপারেশন নয়। এলাকাটি সুরক্ষিত করে ইউরেনিয়াম সরাতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এমনকি সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার জন্য সেখানে অস্থায়ী বিমানঘাঁটিও তৈরি করতে হতে পারে।
পেন্টাগন এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই অভিযানের প্রস্তুতি নিলেও হোয়াইট হাউস একে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, কমান্ডার-ইন-চিফকে সব ধরনের বিকল্প হাতে রাখা পেন্টাগনের কাজ, তার মানে এই নয় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চললেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনও কোনো সরাসরি সংলাপ হয়নি। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন, তিনি আলোচনার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের পক্ষপাতি, কিন্তু ইরান যদি তা না দেয়, তবে শক্তিপ্রয়োগই শেষ রাস্তা।
এই অভিযান শুরু হলে তা ইরান ও আমেরিকার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। পেন্টাগন ইতিমধ্যেই ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপার এবং মেরিন র্যাপিড রেসপন্স ইউনিটগুলোকে প্রস্তুত রেখেছে। আরও ১০ হাজার অতিরিক্ত গ্রাউন্ড ট্রুপ পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনাধীন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনেই আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে এমন এক উচ্চ-ঝুঁকির অভিযান সফল হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পাল্লা ভারী হবে, কিন্তু ব্যর্থ হলে তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবে।