নিউইয়র্ক টাইমস এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংগৃহীত ভিজ্যুয়াল প্রমাণের ভিত্তিতে একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরান-মার্কিন যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এমন একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যা আগে কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষা করা হয়নি। দক্ষিণ ইরানের লামের্দ শহরে এই প্রাণঘাতী হামলায় একটি স্পোর্টস হল এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিধ্বস্ত হয়েছে, যার ফলে কমপক্ষে ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
পেন্টাগন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করেছে তার নাম ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’বা সংক্ষেপে- প্রিজম। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর ঠিক উপরে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এটি বিস্ফোরণের সাথে সাথে হাজার হাজার ছোট টংস্টেন দানা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। লামের্দ শহরের ওই স্পোর্টস হল এবং বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকাগুলোতে ঠিক এই ধরনের বুলেটের মতো টংস্টেন দানার চিহ্ন এবং ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
একই দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি, মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কয়েকশ মাইল দূরে মিনাব শহরে আরেকটি স্কুলে আঘাত হানে, যাতে ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়। তবে, লামের্দের ঘটনাটি ভিন্ন ছিল কারণ এখানে ব্যবহৃত অস্ত্রটি ছিল একদমই নতুন এবং পরীক্ষামূলক।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও বিশ্লেষণ: নিউ ইয়র্ক টাইমস ল্যামের্দে হওয়া হামলার ভিডিও এবং সেটির পরবর্তী ফুটেজগুলো যাচাই করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র আবাসিক এলাকায় মাঝ আকাশে প্রচণ্ড অগ্নিগোলকের মতো বিস্ফোরিত হচ্ছে। অন্য একটি ভিডিওতে স্পোর্টস হলের ঠিক উপরে বিস্ফোরণটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের ছবিগুলোতে দেখা গেছে যে পুরো এলাকাটি ছোট ছোট ছিদ্রে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, যা প্রিজম ক্ষেপণাস্ত্রের টংস্টেন দানার বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়।
বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও আক্রান্ত এলাকা: হামলার শিকার স্পোর্টস হলটির পাশেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি কম্পাউন্ড ছিল। তবে, স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, গত ১৫ বছর ধরে ওই স্পোর্টস হল এবং স্কুলটি দেয়াল দিয়ে কম্পাউন্ড থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল এবং এগুলো সম্পূর্ণ বেসামরিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ২১ জনের মধ্যে ছোট শিশু এবং খোলোয়াড়রাও রয়েছে। জাতিসংঘের ইরানি প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, হামলার সময় স্পোর্টস হলে একটি নারী ভলিবল দল প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। নিহতদের মধ্যে হেলমা আহমাদিজাদে (চতুর্থ শ্রেণী) এবং এলহাম জায়েরি (পঞ্চম শ্রেণী) নামের দুই স্কুলছাত্রী এবং তাদের কোচ মাহমুদ নাজাফি রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় একশ জন মানুষ এই হামলায় আহত হয়েছেন।
ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ও সামরিক প্রতিক্রিয়া: লকহিড মার্টিনের তৈরি এই প্রিজম ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রায় ৪০০ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার নিশ্চিত করেছেন, প্রথমবারের মতো এই ক্ষেপণাস্ত্রটি যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
পেন্টাগন প্রায়শই যুদ্ধকালীন মূল্যায়নের জন্য উন্নয়নশীল অস্ত্র সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করে। তবে এই ক্ষেত্রে অস্ত্রটির যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, নাকি লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনে ভুল করা হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, তারা এই রিপোর্টগুলো খতিয়ে দেখছেন, তবে তিনি দাবি করেছেন মার্কিন বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না।
লামের্দ শহরে হামলার ফুটেজ এবং ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন, পরীক্ষামূলক এই অস্ত্রটি বেসামরিক এলাকায় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে। দক্ষিণ ইরানে পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন ও ইসরাইলি জোট সম্মিলিতভাবে কাজ করলেও ওই নির্দিষ্ট এলাকায় মার্কিন বাহিনীর সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল বলে সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।