মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে যখন যুদ্ধের দাবদাহ চরমে, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউস থেকে এল এক অভাবনীয় ঘোষণা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ইরান থেকে পাততাড়ি গুটাতে পারে মার্কিন বাহিনী। খবর রয়টার্সের।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্তি টানতে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিরও প্রয়োজন নেই বলে সোজা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, চুক্তি হোক বা না হোক, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাবে আমেরিকা। তবে ট্রাম্পের এই ‘শান্তি বার্তার’ সমান্তরালে পারস্য উপসাগর জুড়ে চলছে ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা খুব শিগগিরই ইরান ছাড়ছি, হয়তো দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, তেহরানের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে এবং তারা যুদ্ধের ‘শেষ রেখা’ দেখতে পাচ্ছেন। তবে এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র এবং নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্প বেশ চাপে রয়েছেন। রয়টার্সের এক জরিপ বলছে, দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকানই এখন এই যুদ্ধ থেকে মুক্তি চায়।
ট্রাম্প যখন সেনা প্রত্যাহারের গল্প শোনাচ্ছেন, তখন বুধবার ভোরে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে শুরু হয়েছে নারকীয় আক্রমণ। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। বাহরাইনের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানেও ইরানি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর খবরটি এসেছে কাতার থেকে; তাদের জলসীমায় কাতার-এনার্জির একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইরানি ক্রুজ মিসাইল সরাসরি আঘাত হেনেছে। যদিও কোনো হতাহতের খবর মেলেনি, তবে সমুদ্রের নীল জল এখন বারুদের গন্ধে ভারী।
তেহরানের আকাশে বুধবার ভোরেও শোনা গেছে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ। মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের প্রধান প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ‘শহীদ হাকানি পোর্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জবাবে ইসরাইলের কেন্দ্রস্থলে রকেট বৃষ্টি ঝরিয়েছে ইরান।
প্রথমবার ইয়েমেনের হুতি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরান যৌথভাবে ইসরাইলে এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। লেবাননের বৈরুতে ইসরাইলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে তিন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষীও রয়েছেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ ইন্দোনেশিয়া জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক নজিরবিহীন হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, বুধবার রাত ৮টা থেকে তারা অ্যাপল, গুগল, মাইক্রোসফট এবং টেসলার মতো ১৮টি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাবে। তাদের দাবি, এই কোম্পানিগুলোই ইরানি নেতাদের অবস্থান শনাক্ত করে ‘টার্গেটেড কিলিং’-এ সহায়তা করছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ৩ শতাংশ কমে গেছে। তবে মিত্রদের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ কমেনি। নেটো সদস্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই যুদ্ধে যথেষ্ট সহায়তা করেনি বলে অভিযোগ তুলেছেন রুবিও। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুদ্ধ শেষ হলে নেটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ট্রাম্পের মুখে বিদায়ের সুর, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে মিসাইল আর ড্রোনদের উন্মাদনা। বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে ট্রাম্পের ভাষণই হয়তো বলে দেবে, এই আগুনের খেলা কি সত্যিই থামবে, নাকি এটি শুধু এক বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস।