যেভাবে উদ্ধার করা হয় নিখোঁজ মার্কিন সেনাকে

ইরানের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর নিখোঁজ দ্বিতীয় মার্কিন সেনাকে এক ‘অলৌকিক’ ও দুঃসাহসিক অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এই অভিযানের কথা জানিয়ে, একে ‘মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ‘দুঃসাহসিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গত শুক্রবার দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। বিমানে থাকা দুইজন ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে আগেই উদ্ধার করা হয়েছিল, কিন্তু দ্বিতীয়জন, যিনি একজন কর্নেল এবং বিমানের ‘ওয়েপন সিস্টেম অফিসার’ হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।

ট্রাম্পের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই বীর যোদ্ধা শত্রুপক্ষের সীমানার ভেতরে ইরানের অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আটকা পড়েছিলেন। ইরানি বাহিনী তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল এবং সময়ের সাথে সাথে তারা ওই সেনার খুব কাছে চলে আসছিল। তবে, শেষ পর্যন্ত তাকে ‘নিরাপদ ও অক্ষত’ অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
সিআইএ-এর চাতুর্য ও ছদ্মবেশী কৌশল

ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উদ্ধার অভিযানে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপ্রচলিত ভূমিকা পালন করেছে। সিআইএ ইরানের অভ্যন্তরে একটি ‘বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা’ চালায়, যেখানে ছড়িয়ে দেয়া হয় মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে ওই সেনাকে খুঁজে পেয়েছে।

যখন ইরানিরা এই খবরে বিভ্রান্ত ছিল, তখন সিআইএ স্থানীয় কিছু বেসামরিক নাগরিকের সাথে যোগাযোগ করে, যারা ওই সেনাকে আশ্রয় দিতে রাজি ছিল। পরে তার নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়।

ছবি: সংগৃহীত
এক জটিল ও দুর্ধর্ষ সামরিক অপারেশন

নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, শনিবার রাতে শুরু হওয়া এই ৪৮ ঘণ্টার অভিযানে শত শত স্পেশাল ফোর্সের সদস্য, ডজনখানেক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং সাইবার ও মহাকাশ গোয়েন্দা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। উদ্ধারকাজ চলার সময় মার্কিন বাহিনীর সাথে ইরানি বাহিনীর সরাসরি সংঘর্ষ বা ‘ফায়ারফাইট’ শুরু হয়। ইরানি কনভয়গুলোকে দূরে রাখতে মার্কিন অ্যাটাক এয়ারক্রাফটগুলো ওই এলাকায় বোমা বর্ষণ করে।

অভিযানের এক পর্যায়ে এক নাটকীয় মোড় আসে। কমান্ডো এবং উদ্ধারকৃত সেনাকে নিয়ে ফেরার সময় দুটি মার্কিন ট্রান্সপোর্ট বিমান ইরানের একটি প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আটকে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কমান্ডোরা দ্রুত নতুন তিনটি বিমানে চড়ে সবাইকে নিয়ে আকাশপথে উড়ে যান এবং অকেজো হয়ে যাওয়া আগের দুটি বিমানকে উড়িয়ে দেন, যাতে সেগুলো ইরানের হাতে না পড়ে।

ছবি: সংগৃহীত
ইরানি বাহিনীর তৎপরতা ও ক্ষয়ক্ষতি

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিখোঁজ সেনার সন্ধানে আসা একটি মার্কিন ড্রোন তারা ইসফাহান প্রদেশে ভূপাতিত করেছে। এছাড়া আইআরজিসি জানিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী যাযাবর উপজাতিরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। বিবিসির পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও যাচাই করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে রাইফেল থেকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়।

ছবি: সংগৃহীত
পেন্টাগনের দম্ভ ও ট্রাম্পের বক্তব্য

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বিশাল অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের আকাশে ‘একচ্ছত্র আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব’  অর্জন করেছে। তিনি আরও জানান, হোয়াইট হাউস থেকে ২৪ ঘণ্টা ওই সেনার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল এবং তার উদ্ধার পরিকল্পনা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল।

উদ্ধারকৃত ওই কর্নেল বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তার আঘাত গুরুতর নয় বলে জানানো হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শত্রুদেশের ভূখণ্ডের এত গভীরে গিয়ে এমন নিখুঁত সমন্বয় এবং সফল উদ্ধার অভিযান মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সক্ষমতার এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। তবে এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও চরম উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি-নিউইয়র্ক টাইমস-ফক্স নিউজ