শত্রুর চোখে এড়িয়ে ৪৮ ঘন্টা লুকিয়ে ছিলেন সেই মার্কিন সেনা

ইরানের দুর্গম ও বৈরী পাহাড়ি দুর্ভেদ্য অঞ্চলে টানা ৪৮ ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটানোর পর অবশেষে অলৌকিকভাবে উদ্ধার পেলেন ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের সেই নিখোঁজ ক্রু সদস্য। গত শুক্রবার বিমানটি ইরানি বাহিনীর গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে এই কর্নেল পদমর্যাদার এক ক্রুর ভাগ্য নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই এই উদ্ধার অভিযানের কথা জানান।

রোববার এক সরাসরি বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা তাকে পেয়েছি!’ তিনি নিশ্চিত করেছেন, ওই সেনা এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সুস্থ আছেন।


বিধ্বস্ত বিমান থেকে ইজেক্ট করার পর ওই অফিসার নিজেকে শত্রুবেষ্টিত পার্বত্য এলাকায় আবিষ্কার করেন। তার কাছে ছিল মাত্র একটি পিস্তল, একটি সংকেত পাঠানোর যন্ত্র এবং জিপিএস ট্র্যাকার। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, প্রায় দুই দিন ধরে তিনি ইরানি বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পাহাড়ের উঁচু স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন।

একদিকে ইরানি সেনারা স্থানীয়দের পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, অন্যদিকে ওই সেনা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মার্কিন বাহিনীর সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে নিজের অবস্থান জানিয়ে যাচ্ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সিআইএ-এর সহায়তায় স্থানীয় কিছু সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর আশ্রয়ও তিনি পেয়েছিলেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এই ৪৮ ঘণ্টা ছিল সময়ের সাথে এক ভয়াবহ লড়াই। তাকে উদ্ধারের জন্য শত শত স্পেশাল অপারেশন ফোর্স, ডজনখানেক যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টার নিয়োজিত করা হয়। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এই মিশনকে ‘মার্কিন বিশেষ অভিযানের ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও কঠিন’ বলে বর্ণনা করেন।


উদ্ধারকাজ চলাকালীন পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল, মার্কিন অ্যাটাক এয়ারক্রাফটগুলো ইরানি কনভয়কে ঠেকাতে তাদের ওপর সরাসরি বোমা বর্ষণ শুরু করে। উদ্ধারকারী দলের কাছাকাছি ইরানি বাহিনী পৌঁছে গেলে সেখানে একটি বড় ধরনের বন্দুকযুদ্ধ বা ‘ফায়ারফাইট’ শুরু হয়।

উদ্ধার অভিযানটি মোটেও সহজ ছিল না। অভিযানের শুরুতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ছোট অস্ত্রের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর ক্রু সদস্যরা আহত হন। এমনকি কভার দেয়ার কাজে নিয়োজিত একটি যুদ্ধবিমানও আক্রান্ত হয় এবং এর পাইলট পারস্য উপসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন।

সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে তখন, যখন উদ্ধারকারী দলকে নিয়ে ফেরার জন্য অপেক্ষারত দুটি ট্রান্সপোর্ট বিমান ইরানের একটি প্রঘাঁটিতে অকেজো হয়ে পড়ে। ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে কমান্ডোরা বিমান দুটিকে উড়িয়ে দেন এবং অতিরিক্ত তিনটি বিমানে করে সবাইকে নিয়ে নিরাপদে কুয়েতে পাড়ি জমান।


প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ করেছেন, গত দুই দিনে আলাদাভাবে দুইজন মার্কিন পাইলটকে ইরানের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যা সামরিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। প্রথম উদ্ধারকাজটি অত্যন্ত গোপনে রাখা হয়েছিল যাতে দ্বিতীয়জনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

২০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান সরাসরি যুদ্ধে ভূপাতিত হলো। ট্রাম্প এই সফলতাকে আমেরিকার ‘একচ্ছত্র আকাশ আধিপত্যের’ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা আমাদের কোনো যোদ্ধাকে কখনোই শত্রুর পেছনে ফেলে আসব না। বর্তমানে উদ্ধারকৃত ওই সেনা কুয়েতে চিকিৎসাধীন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে।