মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে এখন শুরু হয়েছে নজিরবিহীন ‘শব্দযুদ্ধ’। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অশালীন গালিগালাজ ভরা চরম হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইরানি দূতাবাসগুলোর বিষাক্ত বিদ্রূপ, সব মিলিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার এখন হিমাঙ্কে।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক বিস্ফোরক পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে রীতিমতো ‘পাগল হারামি’ বলে সম্বোধন করেছেন। জনৈক মার্কিন পাইলটকে উদ্ধারের ঘটনাকে ‘বিস্ময়কর’ আখ্যা দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামী মঙ্গলবার ইরানে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ এবং ‘ব্রিজ ডে’ পালিত হবে।
অর্থাৎ, ওইদিন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো গুঁড়িয়ে দেবে আমেরিকা। ট্রাম্পের সোজা কথা, হরমুজ প্রণালী খুলে দাও, নয়তো নরকে বাস করার জন্য তৈরি হও। শুধু দেখে যাও কী হয়!
ট্রাম্পের এই তর্জন-গর্জন শুনে দমে যাওয়া তো দূর, উল্টো কোমর বেঁধে বিদ্রূপে নেমেছে তেহরান। ১৯৮০ সালে ইরানে মার্কিন জিম্মিদের উদ্ধারে গিয়ে কমান্ডোদের ব্যর্থ অভিযান ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’-এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) ইরানি দূতাবাস লিখেছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাবাস মরুভূমিতে আমেরিকার সেই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার কথা মনে আছে তো? ইরানের দাবি, উদ্ধার অভিযানের নামে আমেরিকা আসলে ধোঁকা দিচ্ছিল, যা তাদের বাহিনী সময়মতো রুখে দিয়েছে।
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট যখন মার্কিন সেনাদের নিয়ে ‘গর্বিত’ হওয়ার পোস্ট দেন, তখন ইরান সেই আগুনেই ঘি ঢালে। ইরানি দূতাবাস পাল্টা লিখেছে, তালিকায় এগুলোও যোগ করুন- স্কুলের শিশুদের হত্যা করা, হাসপাতাল-বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানো এবং গাজায় ইসরাইলের গণহত্যায় সমর্থন দেওয়া নিয়ে আপনারা গর্বিত। ওহ, এপস্টাইন মামলার কথা ভুলবেন না যেন!
একদিকে যখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা নিয়ে ট্রাম্প আর খামেনির মধ্যে যুদ্ধংদেহী অবস্থা, অন্যদিকে তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে অদ্ভুত এক উদাসীনতা।
এএফপির খবর অনুযায়ী, শহরের বড় একটি পার্কে যখন তরুণরা উচ্চস্বরে টেকনো মিউজিক বাজিয়ে পিকনিক করছে আর ফ্রিসবি খেলছে, তখন পাশেই এক ব্যক্তি মিলান টাওয়ারের সামনে মনের সুখে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। ট্রাম্পের ‘নরক’ বানানোর হুমকি যেন তাদের কানেই পৌঁছায়নি!
তবে লড়াইয়ের ময়দান কিন্তু শান্ত নেই। লেবাননের কাফার হাত্তাতে ইসরাইলি হামলায় একই পরিবারের ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। ওদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আরব দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চলতেই থাকে, তবে তার তেজস্ক্রিয়তা তেহরানে পৌঁছানোর আগেই কুয়েত, বাহরাইন বা কাতারের জীবন শেষ করে দেবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের গালিগালাজ আর ইরানের রসাল বিদ্রূপের আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গই হতে পারে মহাপ্রলয়ের কারণ।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি