মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমনে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে পাকিস্তান। বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ঘোষণা করেছেন, তার সরকারের মধ্যস্থতায় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। আগামী ১০ এপ্রিল থেকে রাজধানী ইসলামাবাদে এই সংঘাত নিরসনে চূড়ান্ত শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হবে।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পাকিস্তানের জন্য গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়। যেখানে অনেক বিশ্লেষক পাকিস্তানের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে ইসলামাবাদ অত্যন্ত জটিল এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটে নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য সেতু হিসেবে প্রমাণ করেছে। পাকিস্তানের এই সফলতার পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণ কাজ করেছে:
উভয় দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক: পাকিস্তান এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ যার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পক্ষের সাথেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ইরানের সাথে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং গভীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সংযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ।
ওয়াশিংটনে তেহরানের প্রতিনিধি: যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কোনো দূতাবাস না থাকায়, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনে ইরানি স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী দেশ হিসেবে কাজ করে আসছে।
ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক: পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি ইতিবাচক ব্যক্তিগত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, পাকিস্তান ইরানকে অন্যদের চেয়ে ভালো চেনে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব: পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতায় চীনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন এবং সৌদি আরবের সাথে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীন এবং সৌদি আরবে ঝটিকা সফর করে এই শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি প্রস্তুত করেন। চীনও এই সংকট নিরসনে পাকিস্তানের অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেছে।
পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থ: এই যুদ্ধবিরতি পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত জরুরি ছিল। জ্বালানি আমদানির জন্য পাকিস্তান হরমুজ প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঘাটতি পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলত। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারত ও আফগানিস্তানের সাথে উত্তপ্ত সম্পর্কের মাঝে ইরানের সাথে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আগামীর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দাবি করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ সব জায়গাতেই কার্যকর হবে, যদিও ইসরাইল লেবানন ফ্রন্টে তাদের অভিযান নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। ১০ এপ্রিল থেকে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় পাকিস্তান দু’দেশের মধ্যে সরাসরি আলাপচারিতার পরিবেশ তৈরি করবে। যদি সরাসরি বৈঠক সম্ভব না হয়, তবে পাকিস্তান 'শাটল ডিপ্লোম্যাসি'র মাধ্যমে উভয় পক্ষের দাবি ও ভাষা সমন্বয় করে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর সুযোগই তৈরি করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামাবাদের অবস্থানকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্ব এখন ১০ এপ্রিলের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে নির্ধারিত হবে এই সাময়িক বিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না।
তথ্যসূত্র: ফ্রেঞ্চ টোয়েন্টিফোর