মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে পাকিস্তান এক অভাবনীয় কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে এই যুদ্ধ বন্ধে তাদের ‘অক্লান্ত প্রচেষ্টার’ জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাগচির সেই বার্তাটি নিজের 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করার মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসলামাবাদের ভূমিকাকে কার্যত স্বীকৃতি দিয়েছেন।
ইসলামাবাদ সংলাপের আহ্বান: প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ঘোষণা করেছেন যে, ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা অবিলম্বে সবখানে, অর্থাৎ লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে রাজি হয়েছে। তিনি আগামী শুক্রবার উভয় দেশের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যাতে একটি স্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে সমস্ত বিরোধের নিষ্পত্তি করা যায়।
তবে এই সফলতার মাঝে একটি ছোট বিপত্তিও ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী শরীফের একটি বার্তার শুরুতে অসাবধানতাবশত ‘ড্রাফট- পাকিস্তান পিএম মেসেজ অন এক্স’ কথাটি থেকে গিয়েছিল। পরে তা সংশোধন করা হলেও বিরোধীরা দাবি করছে, এই বার্তাটি হয়তো হোয়াইট হাউস থেকে সরাসরি পাঠানো হয়েছিল।
পর্দার আড়ালের কূটনীতি: হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেখানে ‘পুরো একটি সভ্যতা আজ রাতে ধ্বংস হয়ে যাবে’বলে হুমকি দিয়েছিলেন, সেখান থেকে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হওয়া এক বিষ্ময়কর ঘটনা। এর নেপথ্যে কাজ করেছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নিপুণ কূটনীতি। জানা গেছে, আসিম মুনির সারারাত জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
কেন উভয় পক্ষ পাকিস্তানকে বিশ্বাস করল?
ইরানের আস্থা: ইরান বর্তমানে তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে ইরানের সীমান্ত এবং দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ইসরাইলের সাথে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় তেহরান ইসলামাবাদকে নিরাপদ মনে করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা: গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসিম মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া পাকিস্তান বর্তমানে ট্রাম্পের 'বোর্ড অফ পিস'-এর সদস্য হিসেবেও কাজ করছে।
পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থ: পাকিস্তানের এই শান্তির প্রচেষ্টা কেবল পরোপকার নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ। পাকিস্তানের জ্বালানি তেলের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি চাপে পড়েছিল।
ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আফগান ও ভারতের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা বজায় থাকা অবস্থায় পশ্চিম সীমান্তে ইরানের অস্থিরতা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। পাকিস্তান এই শান্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কূটনৈতিক মর্যাদা পেলেও, যদি এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় তবে তার দায়ভার ইসলামাবাদের ওপর আসতে পারে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা নেই কোনো পক্ষকে এই চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য করার। যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে পাকিস্তান এক কঠিন সংকটে পড়বে, আমেরিকার পক্ষ নিলে দেশের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হবে, আর ইরানের পক্ষ নিলে ওয়াশিংটন এবং উপসাগরীয় মিত্রদের বিরাগভাজন হতে হবে।
তাই ইসলামাবাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো আগামী ১০ এপ্রিলের বৈঠককে একটি স্থায়ী ও কার্যকর চুক্তিতে রূপ দেওয়া।
তথ্যসুত্র: এনডিটিভি