পারস্য সাগরের হরমুজ প্রণালীতে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত অবরোধ কার্যকর হওয়ার একদিন পর, ইরান থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করার সময় দুটি তেল ট্যাঙ্কারকে বাধা দিয়েছে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার এবং সেগুলোকে বন্দরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। খবর রয়টাস।
ওই কর্মকর্তা জানান, জাহাজ দুটি ওমান উপসাগরের চাবাহার বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিলো। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে জাহাজ দুটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে এর বাইরে আর কোনো সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এই ঘটনা ট্রাম্পের অবরোধের শুরুর দিকের একটি চিত্র তুলে ধরে। মূলত ইরানকে চাপ দিয়ে বিশ্ব জ্বালানির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' পুনরায় উন্মুক্ত করাই এই অবরোধের লক্ষ্য। উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধে ইরানকে মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার আশা করছেন ট্রাম্প। তার মতে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া গত সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত ছিল, যার মেয়াদ আগামী সপ্তাহে শেষ হতে যাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক নোয়াম রায়দান বলেন, ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী একটি ট্যাঙ্কারকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ইরানি তেল বহনকারী অনেক জাহাজই তাদের অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে রাখে। তিনি বলেন, অবরোধটি কতটা কার্যকর তা আমরা এখনো নিশ্চিত নই। এটি মাত্র দ্বিতীয় দিন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের নির্দেশ মেনে ওমান উপসাগরের ইরানি বন্দরে ফিরে গেছে। সোমবার ওয়াশিংটন সময় সকাল ১০টা থেকে অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ এই বেষ্টনী পার হতে পারেনি বলে দাবি করেছে সামরিক বাহিনী। তবে, চীন দাবি করেছে, তাদের একটি জাহাজ বিনা বাধায় হরমুজ অতিক্রম করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, এই বিশাল অবরোধ কার্যক্রমে ১০ হাজারের সেনা, এক ডজনেরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং কয়েক ডজন বিমান অংশ নিচ্ছে। সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান অভিমুখে বা ইরান থেকে আসছে না, এমন জাহাজগুলোর জন্য তারা হরমুজ প্রণালীতে অবাধ চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করবে।
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প এই অবরোধের ঘোষণা দেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যদিও পরবর্তী আলোচনার আশায় মঙ্গলবার তা কিছুটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল সফল হলে ইরানের দরকষাকষির সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি নষ্ট হয়ে যাবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হবে। তবে অবরোধ একটি যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ, যার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখা প্রয়োজন। এটি তেহরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হামলা এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ইরানের হুমকির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হাজার হাজার মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লেও বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংঘাত থেকে তেহরান আরও কট্টরপন্থী নেতৃত্ব এবং ভূগর্ভস্থ উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রায়দান সতর্ক করে বলেন, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। অতীতে জাহাজ আক্রমণ এবং মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে এমন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার হুমকির কথা মাথায় রেখে তিনি মন্তব্য করেন, আমরা এখন একটি পরীক্ষামূলক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।