পারস্য উপসাগরের আকাশে যুদ্ধের যে ঘনঘটা দেখা দিয়েছিল, তা নিরসনে এবার আশার আলো দেখছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। ২২ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এর সময়সীমা বাড়ানো এবং ভঙ্গুর এই শান্তি প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধিতে ‘নীতিগতভাবে একমত’ হয়েছে।
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মধ্যস্থতাকারীরা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের মতো জটিল বিষয়গুলোতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বুধবার পার্লামেন্টে দেয়া এক ভাষণে জানান, আঙ্কারা এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং উত্তেজনা প্রশমনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। যদিও তিনি সতর্ক করেছেন, লেবাননের ওপর ইসরাইলি হামলা শান্তির এই সুযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তবুও যুদ্ধের চেয়ে শান্তির সুফল অনেক বেশি, এই মূলমন্ত্রে অবিচল থাকলে সংকট সমাধান সম্ভব।
এদিকে, দীর্ঘদিন সম্পর্কের টানাপোড়েন চলার পর বুধবার এক ঐতিহাসিক টেলিফোন সংলাপে মিলিত হয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উত্তেজনা হ্রাসের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ, যা সংকট নিরসনে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নয় বরং সংলাপ চায়। তবে তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কোনো দেশ যদি ইরানের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায় কিংবা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে, তবে তা ব্যর্থ হবে। আন্তর্জাতিক মানবিক নীতি ও আইনের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বেসামরিক এলাকা, স্কুল ও হাসপাতালে হামলা চালানোর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে কি না। বর্তমানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে এপির খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করলেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকটে জর্জরিত দেশগুলোকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সেটিই এখন আইএমএফ-এর মূল ফোকাস। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে তেল, গ্যাস, ন্যাপথা ও হিলিয়ামের মতো পণ্যের যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে, তা নিয়ে আইএমএফ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
পারস্য উপসাগরের এই সংঘাত এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল হুমকি। মধ্যস্থতাকারীদের এই ‘নীতিগত ঐক্য’ যদি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে ২২ এপ্রিলের পরও শান্তির পথে যাত্রা অব্যাহত থাকবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্বকে যুদ্ধের আতঙ্ক থেকে কতটা মুক্তি দিতে পারে।