চীনের গুপ্তচর উপগ্রহ ব্যবহার করে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের নিখুঁত হামলা!

মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলার জন্য ইরান চীনের তৈরি একটি অত্যাধুনিক গুপ্তচর উপগ্রহ ব্যবহার করেছে। বুধবার প্রকাশিত ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ (এফটি)-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) চীনের কাছ থেকে প্রায় ৩৬.৬ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ‘TEE-01B’ নামক এই শক্তিশালী স্যাটেলাইটটি সংগ্রহ করে।


প্রাপ্ত তথ্য ও কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন এবং ইরাকে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার আগে ও পরে ইরানি কমান্ডাররা এই উপগ্রহটি ব্যবহার করে নজরদারি চালিয়েছিলেন। বিশেষ করে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে হামলার সময় এই উপগ্রহের পাঠানো ছবি ও তথ্যের মাধ্যমেই ইরান নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, ১৫ মার্চ খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন যে, প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হামলার মুখে মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তারা সৌদি আরবের তায়েফ এলাকায় অবস্থিত কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য রিয়াদকে অনুরোধ জানায়। কিন্তু চীনের এই অত্যাধুনিক উপগ্রহ ইরানকে জিবুতির ক্যাম্প লেমনিয়ার, কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটি এবং ওমানের দুকম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পর্যন্ত নজরদারি করার সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে মার্কিন বাহিনীর পিছিয়ে যাওয়ার কৌশলও ইরানের নজরদারি থেকে রক্ষা পায়নি।


ইরানের নিজস্ব সামরিক স্যাটেলাইট ‘নূর-৩’-এর ইমেজ রেজোলিউশন ছিল মাত্র ৫ মিটার। কিন্তু চীনের তৈরি ‘TEE-01B’ উপগ্রহটির রেজোলিউশন মাত্র আধ মিটার বা ৫০ সেন্টিমিটার, যা পশ্চিমা বাণিজ্যিক উপগ্রহগুলোর সমান। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সুবিধা দিয়েছে। এই স্যাটেলাইটটি নির্মাণকারী চীনা কোম্পানি ‘আর্থ আই’ এবং এর সফটওয়্যার সরবরাহকারী ‘এমপোস্যাট’-এর সাথে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটিই প্রথম নয়; এর আগেও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে খবর এসেছিল যে চীন ইরানকে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এছাড়াও কামিকাজে ড্রোন এবং ম্যানপ্যাড (ম্যান-পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে। যদিও চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।


এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, চীনা নেতা শি জিনপিং তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন ইরানকে কোনো অস্ত্র দিচ্ছে না। আগামী মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান এই উত্তজনা সত্ত্বেও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, তিনি বেইজিং পৌঁছালে শি জিনপিং তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাবেন।

চীনের মহাকাশ প্রযুক্তির সহায়তায় ইরানের এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। উন্নত গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমেরিকার যে চিরাচরিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।