গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেল, তাকে এক কথায় ‘ভূ-রাজনৈতিক সার্কাস’ বললেও ভুল হবে না। কখনো প্রণালি খোলা, কখনো বন্ধ; কখনো ধন্যবাদ, তো পরক্ষণেই যুদ্ধের হুমকি—সব মিলিয়ে বিশ্ব তেলের বাজার আর কূটনীতির মঞ্চ এখন রীতিমতো টালমাটাল। মোটের ওপর বলা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে ‘ডিজিটাল যুদ্ধ’ আর নাটকীয় মোড় বদল ঘটেছে, তা যে কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে।
নাটকের শুরু শুক্রবার দুপুরে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতির বাকি সময়টুকুর জন্য হরমুজ প্রণালী ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’। এর মিনিট খানেকের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে বড় বড় অক্ষরে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ লিখে এক গাল হাসলেন। কিন্তু সেই হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্প জুড়ে দিলেন মোক্ষম শর্ত, যতক্ষণ না ইরানের সঙ্গে আমেরিকার লেনদেন ১০০ শতাংশ মিটছে, ততক্ষণ মার্কিন নৌ-অবরোধ সরছে না। অর্থাৎ, ‘ধন্যবাদ দিলাম ঠিকই, কিন্তু তেলের জাহাজ ছাড়ছি না!’
ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী চালে চটে লাল তেহরান। কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তোপ দেগে বললেন, ট্রাম্প এক ঘণ্টায় সাতটি দাবি করেছেন যার প্রতিটিই ‘মিথ্যা’। তিনি সোজা জানান, আমেরিকার নৌ-অবরোধ যদি চলতেই থাকে, তবে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার প্রশ্নই আসে না।
এদিকে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে মাঠে নেমেছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ৪০টি দেশের সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁরা জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবেন।
কিন্তু শনিবার সকাল হতেই দৃশ্যপট আমূল বদলে গেল। ইরানের সামরিক বাহিনী গর্জে উঠে জানাল, আমেরিকা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি, তাই হরমুজ প্রণালী আবারও ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এখন থেকে কোনো জাহাজ পার হতে হলে তেহরানের ‘অফিসিয়াল পারমিশন’ লাগবেই।
সমুদ্রের ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, শনিবার সকালে যেসব জাহাজ একটু বুক ফুলিয়ে এগোচ্ছিল, ইরানের হুমকির পর তারা লেজ গুটিয়ে উল্টো পথে ইউ-টার্ন নিতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন, উপরে ড্রোনের নজরদারি, নিচে মার্কিন রণতরীর অবরোধ আর হরমুজের চাবিকাঠি হাতে ইরানের সামরিক বাহিনী ও শীর্য কর্মকর্তাদের জেদ। ট্রাম্প দ্রুত সমাধানের স্বপ্ন দেখালেও বাঘের গালিবাফের হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছে, হরমুজের জল অতটা সস্তা নয়। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় এই ‘বিড়াল-ইঁদুর’ দৌড় কোন দিকে মোড় নেয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি