শেষ মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জোর প্রচেষ্টা

বুধবারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা যখন ক্ষীণ হয়ে আসছে, তখন মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'মিডল ইস্ট আই' সূত্রে এই খবর জানা গেছে।

আঞ্চলিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তুরস্কের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, গত সপ্তাহান্তে আলোচনার গতিপ্রকৃতি বদলে গেছে। তিনি জানান, আলোচনার অনেকগুলো দিক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও অন্যান্য বিষয়ে দুই পক্ষের মতভেদ এখনো এতটাই প্রকট যে তা মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


প্রস্তাবিত চুক্তির মূল শর্তাবলি:
আলোচনা থমকে যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐকমত্যের আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে- ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি দীর্ঘ মেয়াদে স্থগিত রাখা (ইরান ৫ বছর এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছর স্থগিত রাখার পক্ষে)। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা এবং এর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া। ইরাক ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আংশিক নিরস্ত্র করা। ইরানের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।

পাকিস্তানের ভূমিকা ও ইউরেনিয়াম স্থানান্তর: আলোচনা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরান তাদের সব উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। পাকিস্তান প্রস্তাব দিয়েছে, এই ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে রাখা হবে, যা ইরান মেনে নিয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং মধ্যস্থতাকারীরা বুধবারের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।


হরমুজ প্রণালী ও তেলের বাজার:
প্রস্তাবিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে, তবে প্রতিটি জাহাজ চলাচলের জন্য ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করবে, যা ওমানের সাথে ভাগ করে নেয়া হবে। তবে এই প্রণালী দিয়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হবে না। এছাড়া, প্রতিটি জাহাজের ট্রানজিটের জন্য ইরানের অনুমতির প্রয়োজন হবে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও সামরিক উত্তেজনা: এদিকে পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় নেয় যখন শনিবার ইরান পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। তারা মার্কিন নৌ-অবরোধকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইরান শান্তি চুক্তিতে সই না করে তবে আমেরিকা পুরো দেশ উড়িয়ে দেবে। তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের কিলিং মেশিন বন্ধ করার সময় এসেছে।


সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ:  
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি হলো ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ। খসড়া চুক্তিতে এই গোষ্ঠীগুলোকে আংশিক নিরস্ত্র করার এবং তাদের যোদ্ধার সংখ্যা কমিয়ে ১৫ হাজারে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তারা শুধু আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র রাখবে, তবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আক্রমণাত্মক অস্ত্রগুলো ধ্বংস করে দেয়া হবে। যদিও ইরান এই বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছে।

নেতানিয়াহুর অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা: চুক্তি সফল হলেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে বাধার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকা এবং তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম চুক্তির বাইরে রাখলে তা ইসরাইলের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন, যারা এই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তারাও এই চুক্তিকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ‘পরিত্যাগ’ হিসেবে দেখতে পারে।


মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা:
আলোচনার টেবিলে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। তবে, অন্য একটি সূত্রের দাবি, তার বাবার ওপর হওয়া হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।

সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক ঘণ্টা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত সংকটময়। পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা আশা করছেন, সময়সীমা বাড়ানো গেলে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ স্থায়ীভাবে এড়ানো সম্ভব হতে পারে।