ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অন্দরমহলে এখন ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ পরিস্থিতি। একদিকে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তের শান্তির চেষ্টা, সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই রাজধানী এখন এক মহানাটকের মঞ্চ। এবার, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন শেষ মুহূর্তে এসে একটু ‘মায়া’ দেখালেন!
গত সাতই এপ্রিল ঘোষিত ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ, মঙ্গলবার রাত ৮টায় শেষ হবার কথা থাকলেও, শেষবেলায় ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ঘড়ি আরও ৪৮ ঘণ্টা চলবে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন সময় বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকছে। তবে ব্লুমবার্গকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের গলায় ছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি; তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্ধিত সময়ের মধ্যে কোনো ‘ব্রেক-থ্রু’ না এলে মেয়াদ আর এক মিনিটও বাড়ানো হবে না।
কূটনীতির এই উত্তপ্ত কড়াইয়ে ঘি ঢালতে মঙ্গলবারই ইসলামাবাদে পা রাখছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। লক্ষ্য একটাই, ইরানকে আলোচনার টেবিলে টেনে আনা। কিন্তু ওদিকে তেহরানের মেজাজ এখন সপ্তম আকাশে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এক্সে যুক্তরাষ্ট্রকে ধুয়ে দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলকে ‘নতি স্বীকারের টেবিলে’ পরিণত করতে চাইছে। তার সোজা কথা, চাপ দিয়ে ইরানকে বাগে আনা অসম্ভব।
ইরানের ঝানু রাজনীতিবিদ ঘালিবাফ যখন হুমকির সুরে কথা বলছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তখন কূটনৈতিক চাল চালছেন। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের সাথে ফোনে আরাগচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ জব্দের ঘটনায় তেহরান এতটাই ক্ষুব্ধ যে, তারা দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ সরাসরি ‘নাকচ’ করে দিয়েছিল। আরাগচির মতে, মার্কিন এই উস্কানি আলোচনার পথে সব থেকে বড় দেয়াল।
এই চরম বিশৃঙ্খলার মাঝেও পাকিস্তান হাল ছাড়েনি। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা তেহরান থেকে কিছু ‘ইতিবাচক সংকেত’ পাচ্ছেন। ইরান হয়তো শেষ পর্যন্ত আলোচনায় যোগ দিলেও দিতে পারে, তবে পরিস্থিতি এখনো বেশ ‘তরল’।
এদিকে আলোচনার গুরুত্ব বিবেচনায় ইসলামাবাদের রেড জোনে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মঙ্গলবার পুরো এলাকার অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে ‘রিমোট ওয়ার্ক’ বা অনলাইনে কাজ চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পুরো ইসলামাবাদ এখন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
ট্রাম্পের দেওয়া এই বাড়তি দুই দিন কি শুধুই লোকদেখানো, নাকি পর্দার আড়ালে বড় কোনো সমঝোতা হতে চলেছে? গালিবাফের ‘স্ট্র্যাটেজিক অপশন’ আর ট্রাম্পের ‘বুধবার সন্ধ্যা’- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত ইরানকে টেবিল পর্যন্ত টেনে আনতে পারে, তবেই হয়তো বুধবারের সূর্যোদয় শান্তির বার্তা নিয়ে আসবে; নাহলে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও আগুনের ফুলকি দেখা দেওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।