শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের আধিপত্য আরও জোরালো করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার তেহরান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে তাদের কমান্ডোরা একটি বিশাল মালবাহী জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। ওয়াশিংটন আশা করেছিল আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। খবর রয়টার্স।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, মাস্ক পরিহিত একদল সেনা স্পিডবোটে করে ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ নামক জাহাজের কাছে পৌঁছায় এবং মই বেয়ে সেটিতে উঠে পড়ে। তাদের হাতে ছিল রাইফেল এবং পুরো ঘটনাটি অনেকটা অ্যাকশন সিনেমার মতো আবহ সঙ্গীতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, প্রয়োজনীয় পারমিট ছাড়া প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করায় তারা ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ এবং ‘এপামিনন্ডাস’ নামক দুটি জাহাজকে আটক করেছে।
পাশাপাশি, ইরানের পার্লামেন্টের ভাইস স্পিকার হামিদেরেজা হাজিবাবাই জানিয়েছেন, প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে সংগৃহীত টোলের প্রথম কিস্তির অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। তবে, কারা এই অর্থ প্রদান করেছে বা কত টাকা আদায় হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত ইরানের দখলে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে গত মঙ্গলবার শান্তি আলোচনা বাতিল হওয়ার পর থেকে তেহরান এই নৌপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
পাকিস্তান, যারা এই যুদ্ধের একমাত্র শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করেছিল, তারা জানিয়েছে যে তারা এখনো উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য কোনো প্রতিনিধি দল পাঠানোর নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তেহরানের দাবি, আমেরিকা তাদের নৌ-অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে বসবে না।
তেহরানের সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধ ও শান্তির এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ৩৬ বছর বয়সী সরকারি চাকুরিজীবী আরশ রয়টার্সকে জানান, এই পরিস্থিতি না যুদ্ধ, না শান্তি- সব কিছুই খুব ভীতিকর। যে কোনো মুহূর্তে আমেরিকা বা ইসরাইল হামলা করতে পারে ভেবে মানুষ ভবিষ্যতের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
এদিকে, এই অচলবস্থার কারণে বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৩.৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
রণক্ষেত্রের এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই পেন্টাগনে বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। মার্কিন নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সাথে মতবিরোধ এবং জাহাজ নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে ঝামেলার কারণে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে প্রণালী খুলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, কিন্তু ইরান সেই হুমকি তোয়াক্কা না করে প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে সেখানে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি এখন এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।