পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন আক্ষরিক অর্থেই বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী কার দখলে থাকবে, ওয়াশিংটন নাকি তেহরান- এই প্রশ্নে সোমবার এক চরম নাটকীয় মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ইরানের দাবি, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে তাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের পাল্টাপাল্টি বয়ানে পরিস্থিতি এখন তুঙ্গে। সেন্টকম বলছে, তাদের যুদ্ধজাহাজে মিসাইল হামলা হয়নি।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলা এখন বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সোমবার তেহরান দাবি করেছে, তারা তাদের জলসীমায় অনধিকার প্রবেশের দায়ে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
এমনকি ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ দাবি করেছে, দুটি ইরানি মিসাইল জাস্ক বন্দরের কাছে একটি মার্কিন জাহাজকে আঘাত করেছে। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই মিসাইল হামলার খবরটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বা আটকা পড়া জাহাজ উদ্ধারের অভিযান শুরু হতেই তেহরান ফুঁসে উঠেছে। ১৫ হাজার সেনা আর শতাধিক যুদ্ধবিমান নিয়ে মার্কিন আস্ফালনকে পাত্তাই দিচ্ছে না ইরান। ইরানি কমান্ডারের সোজা কথা, হরমুজের চাবিকাঠি আমাদের হাতে। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ নড়াচড়া করলে বা মার্কিন নৌবাহিনী প্রবেশের চেষ্টা করলে সরাসরি হামলা করা হবে।
এই স্নায়ুযুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি লেগেছে। সোমবার তেলের দাম এক লাফে পাঁচ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত দুই মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ যে কতটা ভঙ্গুর, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
যুদ্ধের এই ঘনঘটার মাঝেও শান্তির এক ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, গত মাসে জব্দ করা একটি ইরানি জাহাজের ২২ জন ক্রু সদস্যকে মুক্তি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান একে দুই দেশের মধ্যে ‘আস্থা তৈরির পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে। খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, তেহরানের দেওয়া ১৪ দফার একটি শান্তি প্রস্তাবের জবাব পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন, যা এখন পর্যালোচনা করছে ইরান।
কেন হঠাৎ ট্রাম্প এতোটা মরিয়া? উত্তরটা সহজ- আসন্ন নভেম্বর নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমনে যেভাবেই হোক হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে চান তিনি। অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আগে যুদ্ধ ও নৌ-অবরোধ বন্ধ করতে হবে, তবেই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।
হরমুজ প্রণালী এখন শুধু একটি জলপথ নয়, এটি এখন ট্রাম্প আর খামেনেইর মধ্যকার এক বিশাল ‘ইগো’র লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের ‘ফোর্সেফুল’ পদক্ষেপের হুমকি, অন্যদিকে ইরানের সমুদ্রসীমায় ‘আমেরিকান-জায়নিস্ট’ শক্তির প্রবেশ ঠেকানোর প্রতিজ্ঞা। তেলের বাজারের এই অস্থিরতা আর সাগরের মাঝপথে রণতরীর মুখোমুখি অবস্থান, সব মিলিয়ে এক বিশাল বিস্ফোরণের অপেক্ষায় বিশ্ব!