ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ যখন এক জটিল রূপ ধারণ করেছে, ঠিক তখনই বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দুই দিনব্যাপী এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, ইরানের ব্যাপারে তাঁর ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে আসছে এবং শি জিনপিংও তাঁর সাথে একমত হয়েছেন যে ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। একই সাথে বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে দুই নেতাই সহমত পোষণ করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে আসে, কারণ যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা এবং দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বেইজিং নিজেও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শি জিনপিং হরমুজ প্রণালীর সামরিকীকরণ এবং এই পথ ব্যবহারের জন্য ইরানের টোল আদায়ের হুমকির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এমনকি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন ভবিষ্যতে আমেরিকা থেকে আরও বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত মাসে আমেরিকা ইরানের ওপর বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও দেশটির বন্দরগুলোতে কঠোর অবরোধ জারি রেখেছে। অন্যদিকে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো উদ্দেশ্য নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইরানের এই ইউরেনিয়ামের মজুদ আমেরিকার হাতে নেওয়াটা আসলে সুরক্ষার চেয়ে ‘পাবলিক রিলেশনস’ বা প্রচারণামূলক উদ্দেশ্যে বেশি প্রয়োজন।
এদিকে মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের একে অপরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর থেকে কূটনৈতিক পথ প্রায় বন্ধ। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে হামলা ও জাহাজ জব্দের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ওমান উপকূলে আফ্রিকা থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী একটি ভারতীয় মালবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায় ডুবে যায়। এছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের কাছে নোঙর করা একটি জাহাজ ইরানি বাহিনী জোরপূর্বক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই যুদ্ধের ফলে ইরান ও তার আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় হাজার হাজার ইরানি নাগরিক নিহত হন। পাশাপাশি, লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় সেখানেও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান আলোচনা কিছুটা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধের ফলে প্রতিবেশী দেশ ও মার্কিন স্বার্থের ওপর আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। তবে রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, ইরান এখনো তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার একটি বড় অংশ টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।
আমেরিকায় আগামী নভেম্বর মাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ এখন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের জন্য একটি বড় বোঝা বা রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি চীনের সমর্থন নিয়ে দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, চীন ইরানকে খুব বেশি চাপ দেবে না, কারণ আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরানকে একটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে বেইজিং।
বর্তমানে ইরানের শাসকরা দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান এখন তাদের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি দাবি করছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স