ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠাতে নারাজ মোজতবা খামেনি

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়ার মাঝেই ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করল ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক কঠোর নির্দেশনায় জানিয়েছেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। ইরানের শীর্ষস্থানীয় দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ওয়াশিংটনের প্রধান শর্তগুলোর একটির বিরুদ্ধে তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান চলমান যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চরম ক্ষুব্ধ করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই নির্দেশের পর হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমরা ওই ইউরেনিয়াম কেড়েই নেব। ওটা আমাদের প্রয়োজন নেই, আমরা ওটা চাইও না। পাওয়ার পর আমরা সম্ভবত তা ধ্বংস করে ফেলব, কিন্তু কোনোভাবেই তা ইরানের কাছে রাখতে দেব না।

ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছেন, যে কোনো শান্তি চুক্তিতে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশ থেকে বের করে দেওয়ার শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

Iran War 07
অন্য দিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, যতক্ষণ না ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানো হচ্ছে, তেহরান তার প্রক্সি মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করছে এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হচ্ছে,ততক্ষণ তিনি এই যুদ্ধ শেষ বলে গণ্য করবেন না।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে যে, এই মুহূর্তে ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দিলে দেশ মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলার মুখে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

উল্লেখ্য, ইরানের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির কথাই চূড়ান্ত। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ট্রাম্প আমেরিকার ‘রেড লাইন’ বা লাল দাগের ব্যাপারে স্পষ্ট এবং তিনি কেবল মার্কিন জনগণের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান খামেনির ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যায়।

Iran War 01
বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনা বড় অগ্রগতি পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এই আলোচনাকে স্থবির করে রেখেছে।

ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর সন্দেহ রয়েছে যে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত ওয়াশিংটনের একটি ‘কৌশলগত প্রতারণা’। তারা মনে করছে, আমেরিকা নিরাপত্তার একটি ভুয়া আবহ তৈরি করে পুনরায় আকস্মিক বিমান হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরানের প্রধান শান্তি আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও অভিযোগ করেছেন, শত্রুদের দৃশ্যমান ও গোপন তৎপরতা প্রমাণ করে, মার্কিনিরা নতুন হামলার ছক কষছে। ট্রাম্পও গত বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে না এলে তারা পুনরায় হামলা চালাতে প্রস্তুত, তবে ‘সঠিক উত্তর’ পাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পারে।

Iran War 05
ইউরেনিয়াম সংকট ও সম্ভাব্য বিকল্প সমাধান

গত জুনে যখন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। তবে হামলার পর তার কতটুকু অক্ষত আছে তা এখনো অস্পষ্ট।

আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি গত মার্চ মাসে জানিয়েছেন, অবশিষ্ট মজুতের মধ্যে প্রায় ২০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম ইসফাহানের একটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সে এবং বাকি অংশ নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।

যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান তার ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক বিদেশে পাঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের একের পর এক হামলার হুমকির পর তেহরান সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। ইরান অবশ্য দাবি করে আসছে যে, তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম চিকিৎসা খাত এবং তেহরানের একটি গবেষণা চুল্লির জন্য প্রয়োজন, পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য নয়।

Iran War 03
তবে উদ্ভূত সংকট সমাধানের জন্য সম্পূর্ণ আশাহীন নয় মধ্যস্থতাকারীরা। ইরানি সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে তা লঘু বা মিশ্রিত করার মতো কিছু বাস্তবসম্মত ফর্মুলা টেবিলে রয়েছে, যা দুই পক্ষই মেনে নিতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প ইসরায়েলকে পুনরায় সামরিক অভিযানের সবুজ সংকেত দেন নাকি কূটনীতির পথ বেছে নেন।