ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা যখন সুতোয় ঝুলছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে তেহরানের পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক চাল নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করছেন এক কুখ্যাত ইরানি কমান্ডার। তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ওয়াহিদি- বর্তমানে ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় তাঁর পূর্বসূরি মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর ওয়াহিদি এই শীর্ষ পদে আসীন হন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা আহমদ ওয়াহিদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে কোনো ধরনের আপসের সবচেয়ে বড় ও কট্টর বিরোধী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি নিহত জেনারেল পাকপুরের চেয়েও অনেক বেশি উগ্র ও চরমপন্থী ভাবাদর্শের অধিকারী। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী বায়েজ বলেন, ওয়াহিদি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রভাবশালী, তবে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অংশ। ইরানে সব সিদ্ধান্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে ওয়াহিদির কণ্ঠস্বর যে অন্যতম জোরালো, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ওয়াহিদির মতো একজন কট্টরপন্থীর উত্থান প্রমাণ করে, ইরানের নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে দুর্বল বা নির্মূল করার মার্কিন ও ইসরাইলি কৌশল তেহরানের নীতিতে কোনো নরম বা মধ্যপন্থী পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং ওয়াহিদির নেতৃত্বে আইআরজিসি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ (হরমুজ প্রণালী) কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের দাবি-দাওয়ার পারদ আগের যে কোনো আলোচনার চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ওয়াহিদি অত্যন্ত আধিপত্যবাদী এবং কট্টর একজন মানুষ, যিনি ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁকে এড়িয়ে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব। তিনি সেসব নেতাদের একজন, যারা স্পষ্ট মনে করেন যে, আমরা যা চাই তা যদি না পাই এবং ট্রাম্প যদি আবার যুদ্ধ শুরু করতে চান, তবে তাঁকে স্বাগত।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে ছিলেন বলে জানিয়েছেন। তেহরান চুক্তিতে সম্মত না হলে তিনি যুদ্ধ পুনরুজ্জীবিত করার হুমকি দিয়েছেন। যদিও পরে তিনি আলোচনার অগ্রগতির জন্য কিছুটা অপেক্ষা করার কথা বলেছেন, তবে একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সময় ফুরিয়ে আসছে। গত বুধবার সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। দেখা যাক কী হয়। হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, না হয় আমরা এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা বেশ নিষ্ঠুর হবে। তবে আশা করি তেমন কিছু ঘটবে না।
ট্রাম্পের এই পরোক্ষ হুমকির জবাবে গত বুধবার জেনারেল ওয়াহিদি সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক কঠোর বার্তা দেন। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, যদি ইরানের ভূখণ্ডে আর কোনো আগ্রাসন চালানো হয়, তবে যে আগুনের প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছিল এবং যা এতকাল একটি সীমিত আঞ্চলিক যুদ্ধের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে এবং সব সীমান্ত ও অঞ্চলকে ছাড়িয়ে যাবে। আপনারা আমাদের কাছ থেকে বিধ্বংসী আঘাত পাবেন।
এই শীর্ষ কমান্ডার সাধারণত খুব একটা জনসমক্ষে আসেন না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দাবি করা হয়, বৃহস্পতিবার ওয়াহিদি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দ্রুত এই ছবিটিকে ভুয়া ও পুরোনো বলে নাকচ করে দেয় এবং জানায় যে এটি মূলত ২০২৪ সালের একটি ছবি ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানের আলোচনার প্রকাশ্য মুখ হলেও, নেপথ্যে থেকে সবচেয়ে কট্টর নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিচ্ছেন এই ওয়াহিদি। ইরান এখনো এমন কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি হয়নি যা তাদের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ বলে মনে হয়। পরমাণু সমৃদ্ধকরণের মতো সংবেদনশীল ও মূল বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাবেও বিশেষ কোনো ছাড় দেয়নি, যার ফলে আলোচনা বর্তমানে এক গভীর অচলাবস্থায় স্থবির হয়ে আছে।
‘এক ওয়ান্টেড জেনারেলের ইতিহাস’
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরানের ক্ষমতা মূলত ১৯৮০-র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা আইআরজিসি ব্যাকগ্রাউন্ডের একটি ছোট সামরিক চক্রের হাতে চলে গেছে, যার অন্যতম প্রধান মুখ আহমদ ওয়াহিদি।
১৯৫৮ সালে শিরাজ নগরীতে জন্ম নেওয়া ওয়াহিদির পুরো আদর্শ গড়ে উঠেছে পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরপরই তিনি এই ব্যবস্থায় যোগ দেন এবং মাত্র ১৯৮১ সালেই গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান নিযুক্ত হন। এর আগে তিনি ইলেকট্রনিক্স এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
আমেরিকা আইআরজিসি’কে একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলায় ৮৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ওয়াহিদির জড়িত থাকার অভিযোগে ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
তবে আশির দশকে ‘ইরান-কন্ট্রা স্ক্যান্ডাল’ (যেখানে আমেরিকার সহায়তায় ইসরায়েল ইরানের কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করেছিল এবং সেই অর্থ নিকারাগুয়ার কমিউনিস্ট-বিরোধী বিদ্রোহীদের অর্থায়নে ব্যবহৃত হয়েছিল) সেই সময়ে ওয়াহিদির সঙ্গে ইসরাইলিদের যোগাযোগের তথ্যও রয়েছে।
ওয়াহিদি আইআরজিসির এলিট শাখা ‘কুদস ফোর্স’-এর প্রথম প্রধান কমান্ডার ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে আইআরজিসি ও ইরানি সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির হিজাব বিতর্ককে কেন্দ্র করে কাস্টডিতে মৃত্যুর পর ইরানে যে দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা নির্মমভাবে দমন করার অপরাধে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ওয়াহিদির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
সে সময় তিনি ইরানি নারীদের আইন ভাঙার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর বর্বর বলপ্রয়োগের ঘটনাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন।
কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানিসহ আহমদ ওয়াহিদির একাধিক পূর্বসূরি মার্কিন ও ইসরাইলি গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। ফলে এক অশনি সংকেত ও মৃত্যুর ছায়া স বসময় তাঁর পিছু তাড়া করছে। ড্যানি সিট্রিনোভিচের ভাষায়, তিনি একজন ওয়ান্টেড ম্যান এবং মোটেও হেলাফেলা করার মতো মানুষ নন। তাকে সমীহ করে চলতে হবে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন