সুর নরম করে ইরানকে ট্রাম্প-রুবিওর নতুন হুঁশিয়ারি

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার তিন মাস বয়সী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক চেষ্টায় সোমবার কিছুটা ভাটা পড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান, উভয় পক্ষই একযোগে জানিয়েছে, এখনই কোনো বড় ধরনের চুক্তির আশা করা ঠিক হবে না। এরই মধ্যে মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, ওয়াশিংটন হয় একটি ‘ভালো চুক্তি’ করবে, নয়তো ইরানের সাথে ‘অন্য উপায়ে’ বোঝাপড়া করবে।

নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, বিকল্প পথ বা ‘অন্য পন্থা’ খোঁজার আগে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে সফল হওয়ার শেষ সুযোগ দিতে চায়। এর আগের দিনই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো না করতে।

Iran War 04
রুবিও আরও যোগ করেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া এবং পারমাণবিক বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা শুরু করার মতো একটি বেশ শক্ত প্রস্তাব এখন টেবিলে রয়েছে। আশা করি আমরা এটি সফল করতে পারব।

অন্যদিকে সোমবার ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে কড়া ভাষায় লিখেছেন, এই চুক্তি হয় অসাধারণ ও অর্থপূর্ণ হবে, অন্যথায় কোনো চুক্তিই হবে না।

এদিকে তেহরানে এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, অনেকগুলো বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হতে পারলেও তার মানে এই নয় যে তারা চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

বাঘাই খোলসা করেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি মূলত ১৪ দফার। এর মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান ঘটানো, যার বিনিময়ে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে ইরান।

তিনি স্পষ্ট করে দেন, বর্তমান আলোচনা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে হচ্ছে না। যদি এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি সফল হয়, তবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে দরকষাকষি করা হবে। অথচ ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যই হলো ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেঁটানো, যদিও তেহরান বরাবরই পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা অস্বীকার করে আসছে।

Iran War 05
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও মাশুল বিতর্ক:
বাঘাই আরও জানান, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া এই হরমুজ প্রণালী পরিচালনার সুনির্দিষ্ট কোনো খুঁটিনাটি এই খসড়া চুক্তিতে নেই। তবে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, ইরান এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে কোনো ‘টোল’ বা শুল্ক আদায় করবে না।

তবে ওমানের সাথে যৌথ প্রটোকলের অধীনে জাহাজগুলোকে নেভিগেশন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো যেসব সেবা দেওয়া হবে, তার জন্য একটি নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জ বা মাশুল দিতে হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে এই প্রণালীটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধপূর্ব সময়ে যেখানে দৈনিক ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলত, এখন সেখানে নামমাত্র কয়েকটি জাহাজ পার হতে পারছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি, খাদ্য ও সার সংকট তৈরি হয়েছে। অবশ্য সোমবার দুই পক্ষ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর খবর ছড়াতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ৪ শতাংশের বেশি কমে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

Iran War 02
পর্দার আড়ালে কাতারের মধ্যস্থতা:
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে বরফ গলার আভাস পাওয়া গেলেও বেশ কিছু জটিল বিষয়ে দুই পক্ষ এখনও বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লেবাননে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ এবং বিদেশে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি ডলারের ইরানি তেলের রাজস্ব ফেরত পাওয়ার দাবি। এই হিমায়িত অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়ে তেহরানে কাতারি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠকের পর সোমবার ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদুলনাসের হেম্মাতি জরুরি সফরে কাতারে গেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম।

রয়টার্সের সূত্র মতে, আগামী দিনগুলোতে জাতিসংঘের পরমাণু ওয়াচডগের (আইএইএ) কড়া নজরদারিতে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তরলীকরণ করার মতো কিছু বাস্তবসম্মত সূত্রের মাধ্যমে পারমাণবিক জট খোলার চেষ্টা করা হতে পারে।

Donald Trump 02
ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ ও যুদ্ধের ক্ষত:
এই যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে তাঁর যুদ্ধকালীন ক্ষমতা খর্ব করার তোড়জোড়ও চলছে। আর এ কারণেই গত এপ্রিলের শুরু থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ট্রাম্প যুদ্ধ থামানোর এই কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে পুরতে মরিয়া।

তবে দেশের ভেতরের সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে ট্রাম্প রোববার গর্জে উঠেছিলেন, আমি যদি ইরানের সাথে চুক্তি করি, তবে সেটি একটি চমৎকার ও উপযুক্ত চুক্তিই হবে। তাই ওইসব ব্যর্থ বা ‘লুজার’দের কথা শুনবেন না, যারা নিজেরা কিছু না জেনেই সব বিষয়ে সমালোচনা করে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি ভয়াবহ বোমাবর্ষণে ইরানের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। একইভাবে লেবাননে ইসরাইলি স্থল ও বিমান হামলায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিপরীতে ইসরাইল ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়ও বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য এখন ট্রাম্প ও খামেনির এই ১৪ দফার দোদুল্যমান চুক্তির ওপরই নির্ভর করছে।