সমঝোতার খবর ভুয়া বলে উড়িয়ে দিলো ইরান

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার ৬০ দিনের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে খবর চাউর হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ দেশটির আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই খসড়া চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত বা নিশ্চিত করা হয়নি। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

তাসনিম নিউজ আরও জানায়, তেহরানের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের কাছেও চুক্তিটি সম্পূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। ইরান সরকার স্পষ্ট করেছে, এই সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত রূপ পেলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারীকে জানানোর পাশাপাশি একযোগে সাধারণ জনগণের সামনেও প্রকাশ করা হবে।

Iran Air Defence 07
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স চারজন নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে খবর প্রকাশ করেছিল, আমেরিকা ও ইরান ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অভাবে তা আটকে আছে।

অন্যদিকে এই খবরের সূত্রপাত করা মার্কিন নিউজ পোর্টাল ‘অ্যাক্সিওস’ জানায়, ৬০ দিনের আলোচনার উইন্ডোতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা-ই হবে প্রধান এজেন্ডা। এই পুরো নাটকীয়তা নিয়ে হোয়াইট হাউস অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

চলতি এই যুদ্ধটি নিয়ে এর আগেও ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকবার ‘চুক্তি খুব কাছাকাছি’ বলে দাবি করলেও প্রতিবারই ইরান তা বিতর্কিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে কিংবা এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন এই যুদ্ধ মাত্র চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে, অথচ যুদ্ধটি এখন তিন মাসে পদার্পণ করেছে। কখনো তিনি বলছেন যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে, আবার কখনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন এটি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

MQ-9 Reaper drone
গত সপ্তাহের শেষের দিকে এই চুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল। কারণ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরকারি জরুরি পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে তাঁর পূর্বনির্ধারিত সব পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং ওয়াশিংটনে অবস্থান করার জন্য নিজের ছেলের বিয়েতেও অংশ নেননি। তবে গত রোববার ট্রাম্প প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা চুক্তিটি খুব দ্রুত হচ্ছে না বলে এর গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দিলেও স্বীকার করেন, চুক্তির মূল রূপরেখা বা কাঠামোর বিষয়ে দুই পক্ষই নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

চুক্তি গড়ার এই জটিল মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিজের দলের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। তাঁর দলের ইরান-বিরোধী কট্টরপন্থীরা ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন, যেন এমন কোনো চুক্তিতে সই না করা হয় যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হবে।

এর পাশাপাশি, আমেরিকার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য এবং বিশেষ করে পেট্রোলের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই অর্থনৈতিক সংকট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ওপর প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

Donald Trump 05
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (প্রতিনিধি সভা) এবং সম্ভবত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ট্রাম্পের দলকে বেশ কঠিন লড়াই করতে হবে।

ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে আসছেন, এই যুদ্ধের পেছনে তাঁর মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা।

যদিও তেহরান শুরু থেকেই পেন্টাগনের এই দাবি অস্বীকার করে আসছে এবং জানিয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। সব মিলিয়ে, একদিকে ইরানের অনড় অবস্থান আর অন্যদিকে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই শান্তি আলোচনা এখন এক গোলকধাঁধায় রূপ নিয়েছে।