হরমুজের পর এবার ইরানের চোখ বাব আল-মান্দেবে!

হরমুজ় প্রণালী নিয়ে বিশ্ববাজারে সৃষ্ট উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের আরও এক লাইফলাইন বা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অচল করে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিল ইরান। তেহরানের সোজা কথা, গাজা এবং লেবাননে ইসরাইলের সামরিক বর্বরতা যদি অবিলম্বে বন্ধ না হয়, তবে হরমুজ প্রণালীর মতোই দশা করা হবে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীরও! গত সোমবার ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান কমান্ডার ইসমাইল কানি বুক ঠুকে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

Bab el-Mandeb 06
ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই বাব আল-মান্দেব প্রণালীটি ইরান থেকে প্রায় দুই-আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সরাসরি সেখানে গিয়ে ইরানের কামানের গোলা দাগা অসম্ভব। কিন্তু তেহরানের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের ছায়াসঙ্গী বা বকলমে খাটানো ‘রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিস’-এর মধ্যে।

এই প্রণালীর উত্তর-পূর্ব দিকেই অবস্থিত ইয়েমেন, যার উপকূলের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইরানের ঘরের ছেলে তথা তাদেরই মদদপুষ্ট সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী। কুদস ফোর্সের কমান্ডার কানি সেদিকেই ইঙ্গিত করে গর্জে উঠে বলেন, আমেরিকার ছত্রছায়ায় থাকা ইসরাইল যদি লেবানন ও গাজায় হামলা বন্ধ না করে, তবে রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিস উভয় যুদ্ধক্ষেত্রেই কড়া পদক্ষেপ করবে।

Bab el-Mandeb 05
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালী কতটা ভয়ঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ, তা এর পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। মাত্র ৩০ থেকে ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এই সরু সামুদ্রিক করিডর দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ৮৮ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবহণ করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, গোটা বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পণ্যবাহী জাহাজ এই রুট দিয়েই যাতায়াত করে। ইউরোপীয়রা একে ভালোবেসে ‘দক্ষিণের প্রবেশদ্বার’ বলে ডাকেন। ইরান যদি হুথিদের লেলিয়ে দিয়ে এই পথ আটকে দেয়, তবে এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যে লাল বাতি জ্বলে যাবে।

Bab el-Mandeb02
জাহাজগুলোকে তখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ দিয়ে যাতায়াত করতে হবে। এর ফলে পথ যেমন দীর্ঘ হবে, তেমনই জ্বালানি খরচ ও জাহাজের ভাড়া আকাশ ছোঁয়া হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে বসে হুথিরা অতীতে বহুবার ড্রোন এবং বিস্ফোরক বোঝাই ছোট ছোট সুইসাইড বোট দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে ঠিকই, কিন্তু এবার এই জলপথ পুরোপুরি কবজায় নেওয়া তাদের জন্য খুব একটা সহজ হবে না। কারণ, প্রণালীর ঠিক উল্টো দিকেই রয়েছে জিবুতি।

Bab el-Mandeb 04
আর এই জিবুতিতে বিশ্বের তাবড় তাবড় পরাশক্তিরা নিজেদের সামরিক আস্তানা বানিয়ে বসে আছে। সেখানে আমেরিকার পাশাপাশি চীন, ফ্রান্স, জাপান এবং ইতালির মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর ভারী সামরিক ঘাঁটি ও নৌবাহিনী ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছে।

এর আগেও গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর পর এই জলপথ বন্ধের ফাঁকা আওয়াজ দিয়েছিল তেহরান, যদিও বাস্তবে তারা কিছুই করতে পারেনি। তবে এবার আমেরিকার সাথে ইরানের পরমাণু চুক্তির দর কষাকষির মোক্ষম সময়ে হুথিদের দিয়ে এই নতুন চাল বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়সড় সুনামি ডেকে আনে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়!