তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আমেরিকা-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধ বর্তমানে এক চরম অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধুঁকছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ইরান ডিল’ বা শান্তি চুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন ধোঁয়াশা। মঙ্গলবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরান আমেরিকার প্রস্তাবিত চুক্তিটি পর্যালোচনা করে দেখলেও গত কয়েক দিন ধরে ওয়াশিংটনের সাথে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ‘মেহর নিউজ’ ও ‘ফারস নিউজ’ এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রস্তাবিত চূড়ান্ত খসড়ার বিষয়ে তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। আমেরিকার অতীতের চুক্তিভঙ্গের ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এবার ইরান অত্যন্ত ‘কঠিন ও কঠোর’ অবস্থান নিয়েছে। সূত্রমতে, গত কয়েক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে বার্তার আদান-প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ। ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো ইরানের শেষ বার্তা ছিল লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত ‘স্পষ্ট ও কড়া’, যেখানে তাদের মিত্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলি স্থল অভিযান ও আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানান হয়।
অথচ এর ঠিক এক দিন আগে, অর্থাৎ সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, আলোচনা দ্রুত গতিতে চলছে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। গত মার্চ মাস থেকেই ট্রাম্প বারবার চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর দাবি করে আসছেন, যা মূলত ইরানের জটিল পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ আলোচনার মতো কঠিন বিষয়গুলোকে আপাতত আড়ালে রেখে একটি সাময়িক স্বস্তি দেবে।
তবে আশার কথার মাঝেই গত সপ্তাহে আমেরিকা ও ইরান পরস্পরের ওপর বেশ ক’বার চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে। চুক্তির এই টানাপোড়েনের মাঝেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করেছে, বিশ্বে তেলের মজুদ ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সর্বাত্মক যুদ্ধে ইতিমধ্যেই ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ বাড়াচ্ছে।
এদিকে, আমেরিকার মধ্যস্থতায় গত সোমবার একটি আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল—যার শর্ত ছিল ইসরায়েল বৈরুতে বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখবে এবং হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ছুড়বে না। কিন্তু আজ মঙ্গলবার লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, সেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ লেবাননের একাধিক শহরে অনবরত বোমাবর্ষণ করে চলেছে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্স ।
বৈরুতের আকাশে ইসরাইলি ড্রোনের অবিরাম ঘরঘর শব্দে ঘরছাড়া ১২ লক্ষ লেবাননি নাগরিক চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে হামলা বন্ধের চুক্তি করায় নিজ দেশেই তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন, যেখানে বছরের শেষে হতে যাওয়া নির্বাচনে তাঁর ভরাডুবির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানি সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তেহরান মূলত নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিতে বড় কোনো ছাড় না দিয়ে শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কমাতেই এই সীমিত মেয়াদের অন্তর্বর্তী চুক্তির পক্ষে ঘুঁটি চালছে। ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি, আটকে থাকা শত কোটি ডলারের তেল রাজস্বের অধিকার ফিরে পাওয়া, তেল রপ্তানিতে ছাড়, ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
অন্যদিকে ট্রাম্পের ওপর চাপ রয়েছে কোনো ছাড় না দিয়েই হরমুজ প্রণালি সচল করে আমেরিকার বাজারে তেলের দাম কমানোর। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প চান হরমুজ প্রণালি খুলে নিজের বিজয় ঘোষণা করতে এবং আমেরিকার বাজারে পেট্রোলের দাম কমাতে। কিন্তু তিনি জানেন, যদি তিনি ইরানের সাথে কোনো দুর্বল বা খারাপ চুক্তি করেন, তবে দেশের মাটিতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বেন। ট্রাম্প এখন শাঁখের করাতে পড়েছেন, তিনি বুঝতে পারছেন না কী করবেন।
এই উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে যখন ইরানের পারমাণবিক রেভোলিউশনারি গার্ডস দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নৌবাহিনীর বিশেষ অনুমতি নিয়ে মাত্র ২৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। শুধু তা-ই নয়, সোমবার ওমান উপসাগরে ইরানি জাহাজে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরাকের উম্মে কাসর বন্দরে বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং গ্রুপ ‘এমএসসি’-র একটি জাহাজে দুটি প্রজেক্টাইল মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়েছে রেভোলিউশনারি গার্ডস।
লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিও বন্ধ করে দেওয়ার যে হুমকি ইরান দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ায় গাজ়া, লেবানন, কঙ্গো, মালি, সোমালিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে জীবনরক্ষাকারী জরুরি মানবিক ত্রাণ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স