এক সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। রোববার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনার উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ডের দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ি রিসোর্ট বার্গেনস্টকে এসে পৌঁছেছেন। তবে এই ঐতিহাসিক কূটনীতি শুরু হতেই তার ওপর বড় কালো ছায়া ফেলেছে ইরানের আকস্মিক সামরিক ঘোষণা। তেহরান জানিয়েছে, তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’তে নতুন করে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে।
গত সপ্তাহে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষ যে সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল, তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা এবং লেবাননসহ সব অঞ্চলে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। কিন্তু মার্চ মাসে ইসরাইলের লেবানন আক্রমণের পর সেখানে চলমান সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ না থাকায়, শনিবার ইরান এই প্রণালী পুনরায় বন্ধের ঘোষণা দেয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই অবরোধের দাবি অস্বীকার করে শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে পারাপার করার কথা জানালেও, রোববার ইরানের ফারস নিউজ এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পারাপারের জন্য নতুন কোনো জাহাজকে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কাতারি মালিকানাধীন সুইস রিসোর্টে শুরু হওয়া এই বৈঠকটি মাত্র একদিন স্থায়ী হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ওয়াশিংটন যেহেতু লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এই বৈঠকটি কেবল পূর্ববর্তী সমঝোতা স্মারকের প্রাথমিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে; পরবর্তী ধাপের কোনো মূল বা নীতিগত বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
এই শান্তি চুক্তির মূল রূপরেখা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইরান ইতিমধ্যে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা, যেমন নিষেধাজ্ঞা মওকুফ এবং ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
সুইস বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে আছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। এর আগে প্রায় দুই মাস আগে তাদের মধ্যে একমাত্র মুখোমুখি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমেরিকা ছাড়ার আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন যে, তিনি পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবানন যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করছেন। মার্কিন দলে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানি দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা যোগ দিয়েছেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনিরও কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এই রিসোর্টে এসে পৌঁছেছেন।
গত শুক্রবার সবশেষ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও লেবাননের মাটিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। ইসরাইলি হামলায় লেবাননের একের পর এক শহর ও গ্রাম এখন গাজা উপত্যকার মতো কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শনিবারও ইসরাইলি বিমান হামলায় ২০ জন নিহত হওয়ার খবর মিলেছে। লেবানন সেনাবাহিনী বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের রাস্তাঘাট থেকে ইসরাইলের ফেলে যাওয়া হাজার পাউন্ড ওজনের অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছে।
এদিকে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথভাবে শুরু করা এই ইরান যুদ্ধ অবসানের চুক্তিটি খোদ ইসরাইলের ভেতর তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। ইসরাইল এই শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়নি। নেতানিয়াহু সরকার সোজা জানিয়ে দিয়েছে, হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে লেবাননের যে অঞ্চলগুলো তারা দখল করেছে, সেখান থেকে তারা সেনা প্রত্যাহার করবে না।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিবেশীদের হুমকি দেয়ার ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেয়া এবং ইরানের জনগণকে সরকার পতনে উদ্বুদ্ধ করা। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা ইরানের সামরিক বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন, তবে বাস্তব চিত্র বলছে, ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি।
ইসরাইলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯২ শতাংশ ইসরাইলি নাগরিক মনে করেন এই যৌথ সামরিক অভিযান থেকে ইসরাইলের চেয়ে ইরান বেশি লাভবান হয়েছে। মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন ইসরাইল এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ ইসরাইলি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধের কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি এবং ৩০ শতাংশেরও কম মানুষ নেতানিয়াহুর বড় বড় সাফল্যের দাবিকে বিশ্বাস করেন। এই চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও হরমুজ প্রণালীর নতুন উত্তেজনার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ে বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল দাবার চাল শুরু হলো।