ব্রিটিশ রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা, ১০ বছরে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী

তীব্র দলীয় চাপ ও জনপ্রিয়তার তলানিতে ঠেকে অবশেষে পরাজয় মেনে নিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটের কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক আবেগঘন ও অশ্রুসিক্ত ভাষণে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি যে আর উপযুক্ত ব্যক্তি নন, দলের সংসদ সদস্যদের সেই বার্তা অনুধাবন করেই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

স্টারমারের এই আকস্মিক প্রস্থানের পর লেবার পার্টির ভেতরে এক তিক্ত ও দীর্ঘ নেতৃত্ব লড়াইয়ের আশঙ্কা করা হলেও, দলের বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। লেবার পার্টির একাধিক আইনপ্রণেতা জানিয়েছেন, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসন থেকে সদ্য বিজয়ী ৫৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের ‘রাজ্যাভিষেক’ বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের শীর্ষ পদে বসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিশেষ করে, বার্নহামের সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং দ্রুত তাঁর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করায় বার্নহামের মসনদে বসার পথ একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেছে। এর ফলে আগামী মাসের মধ্যেই হয়তো ব্রিটেন গত ১০ বছরের মধ্যে তাদের সপ্তম নেতা পেতে যাচ্ছে।

Keir Starmer 11
১০ বছর আগে ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিদায়) ভোটের পর থেকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছিল, তা যেন কাটছেই না। লেবার পার্টির ক্ষমতার রদবদল আসলে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সাধারণ ব্রিটিশ ভোটারদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

স্টারমার জানিয়েছেন, তিনি নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য দলের সাংগঠনিক কমিটিকে একটি সময়সূচি নির্ধারণের অনুরোধ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই মনোনয়ন উন্মুক্ত হবে এবং তা জুলাইয়ের মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যাবে। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তবে সেপ্টেম্বর নাগাদ নতুন প্রধানমন্ত্রী পাবে দেশ। তবে বার্নহামের এই একক আধিপত্যের কারণে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হলে, আগামী জুলাইয়ের মাঝামাঝিতেই তিনি ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পাবেন।

ডাউনিং স্ট্রিটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে স্টারমার বলেন, আমার দল এখন যে প্রশ্নটি তুলছে তা হলো, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমিই কি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? আমি আমার পার্লামেন্টারি দলের কাছ থেকে সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি এবং অত্যন্ত সশ্রদ্ধচিত্তে তা মেনে নিচ্ছি। দুই বছরের শাসনকালের খতিয়ান তুলে ধরার পর, সচরাচর ‘রোবটিক’ বা আবেগহীন বলে সমালোচিত হওয়া স্টারমার শেষ দিকে এসে চরম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

তাঁর গলা কেঁপে ওঠে এবং চোখে জল চলে আসে যখন তিনি পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের এই সবচেয়ে বড় চাকরিটি ছেড়ে দেয়ার পর আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দেব, আমার চমৎকার স্ত্রী ভিকের একজন সেরা স্বামী হওয়া, যে ভাল-মন্দ সব সময়ে আমার পাশে পাথরের মতো শক্ত ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; এবং আমার সুন্দর সন্তানদের একজন সেরা বাবা হওয়া, যারা আমার গর্ব ও আনন্দের উৎস।

Keir Starmer 10
গত পুরো উইকএন্ড জুড়ে স্টারমার তাঁর গ্রামীণ বাসভবনে স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার সাথে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। চারপাশ থেকে সমর্থন চলে যাওয়ায় তিনি বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারেন। দলের ভেতরে স্টারমারের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করে শিল্পমন্ত্রী ক্রিস ম্যাকডোনাল্ড বলেন, তাঁর এই ভাষণ প্রমাণ করে যে তিনি একজন সত্যিই ভদ্র মানুষ। তবে অন্যান্য সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় স্টারমার অন্যদের সাথে যেভাবে নির্মম আচরণ করেছিলেন, আজ দলও তাঁকে ঠিক একইভাবে ক্ষমতার মঞ্চ থেকে ছুঁড়ে ফেলেছে।

কিয়ার স্টারমারের ওপর গত কয়েক মাস ধরে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা গত শুক্রবার এক চূড়ান্ত রূপ নেয়। জনমত জরিপে গত এক বছর ধরে শীর্ষে থাকা নাইজেল ফারাজের উগ্র ডানপন্থী দল- রিফর্ম ইউকের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে মেকারফিল্ড আসন থেকে বার্নহাম যখন পার্লামেন্টে নিজের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেন, তখনই স্টারমারের বিদায়ঘণ্টা বেজে যায়।

লেবার এমপিদের মনে আশা জেগেছে যে, অসাধারণ যোগাযোগ দক্ষতাসম্পন্ন বার্নহাম হয়তো স্টারমারের অধীনে ডুবতে বসা লেবার পার্টির ভাগ্য একাই বদলে দিতে পারেন। আর এই রাজনৈতিক নিশ্চয়তার আভাস পেয়েই বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হয়েছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরকারি বন্ডের বাজারে সুবাতাস বইছে।

সোমবারেও নতুন এমপি হিসেবে শপথ নিতে বার্নহাম যখন লন্ডনে পৌঁছাচ্ছেন, তখন এই মসনদ বদল কিন্তু সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। বার্নহাম এখনও দেশের জন্য তাঁর পূর্ণাঙ্গ নীতি বা রূপরেখা প্রকাশ করেননি। আর এই সুযোগে রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ অবিলম্বে দেশে সাধারণ নির্বাচনের দাবি তুলে ধরেছেন। ফারাজ এক বিবৃতিতে বলেন, আমি আর অপেক্ষা করতে রাজি নই। ব্রিটেনের এখন পরিবর্তন দরকার, আসল পরিবর্তন, এই ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর চাপিয়ে দেওয়া কোনো পুরোনো মুখ আমরা চাই না।

Andy Burnham 06
বার্নহামের সামনে কাঁটাময় পথ ও ফারাজের চ্যালেঞ্জ:
আপাতত দেশের মৌলিক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার খরচ কমানোর বুলি আওড়ালেও, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বার্নহামের অবস্থান কী হবে, তা এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। স্টারমারের মতোই বার্নহামও এসে দেখবেন তাঁর হাত-পা বাঁধা। অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার বিরোধিতা করা বন্ড মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের চাপ যেমন তাঁকে সামলাতে হবে, তেমনই দেশ ঠিকমতো চলছে না বলে ক্ষুব্ধ সাধারণ জনগণের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হবে তাঁকে। উচ্চ ঋণ, সুদের বোঝা, বছরের পর বছর ধরে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কারণে ব্রিটেন ইতিমধ্যে ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭ -এর মধ্যে সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ। এই অর্থনৈতিক খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বার্নহাম কীভাবে ব্রিটেনের হাল ধরেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

তথসূত্র: রয়টার্স