অবারিত অশ্রু, প্রার্থনা আর গভীর শোকের আবহে অবশেষে শায়িত হলেন ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, পবিত্র মাশহাদ শহরের অষ্টম শিয়া ইমাম, ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। মৃত্যুর ১৩১ দিন পর খামেনিকে দাফন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটলো ইসলামি প্রতিরোধ ও সার্বভৌমত্বের এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের।
দাফনের আগে মাশহাদ শহর প্রত্যক্ষ করেছে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এক জানাজা ও শোকযাত্রা। প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে মাশহাদের রাস্তায় নেমে এসেছিল লাখো মানুষের ঢল। কালো আর লাল পোশাকে পুরো শহর যেন রূপ নিয়েছিল এক বিশাল শোকের সাগরে।
নির্দোষ রক্তের বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার এবং শাহাদাতের প্রতীক সম্বলিত লাল পতাকা হাতে ‘ইমাম রেজা এভিনিউ’-তে সমবেত হয়েছিলেন কোটি মানুষ। ভক্ত ও শোকার্তদের এই উপচে পড়া ভিড়ের কারণে কফিনবাহী গাড়িটি ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোচ্ছিল। ফলে বাধ্য হয়েই আয়োজক কমিটি সকালের নির্ধারিত দাফন অনুষ্ঠান পরিবর্তন করে বিকেলে সম্পন্ন করতে বাধ্য হয়।
শাহাদাত ও জাতীয় ঐক্যের নতুন জাগরণ: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ সামরিক আগ্রাসনের প্রথম দিনেই সপরিবারে শহীদ হন ৮৬ বছর বয়সী এই নেতা। তবে, পশ্চিমা শক্তি যে লক্ষ্য নিয়ে এই হামলা চালিয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। খামেনেইর এই শাহাদাত ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দেশটিতে এক নজিরবিহীন জাতীয় ঐক্য এবং বৈপ্লবিক প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছে, যা সীমান্ত পেরিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিক শোকযাত্রা- তেহরান থেকে কারবালা: গত শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ যখন রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধার জন্য রাখা হয়, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, উচ্চপদস্থ কূটনীতিবিদ এবং ধর্মীয় নেতারা সেখানে হাজির হন। এর মাধ্যমে ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার পশ্চিমা চক্রান্ত পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
গত সোমবার তেহরানের মূল সড়কগুলো বন্ধ করে দিয়ে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন কেন্দ্রীয় জানাজায়। পরের দিন মঙ্গলবার শোকযাত্রা পৌঁছায় শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র পবিত্র কোম শহরে। সেখানে জামকারান মসজিদে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাভাদি আমোলি জানাজার নামাজ পড়ান।
ইরানের গণ্ডি পেরিয়ে খামেনেইর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকে। পবিত্র নাজাফ শহরে ইমাম আলীর মাজার এবং কারবালায় ইমাম হোসেন ও হযরত আব্বাসের পবিত্র মাজারে যখন পতাকা-মোড়ানো কফিনগুলো নিয়ে যাওয়া হয়, তখন পুরো ইরাক যেন থমকে গিয়েছিল। লাখো ইরাকি নাগরিক এই মিছিলে অংশ নিয়ে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর অভেদ্য ভ্রাতৃত্বের জানান দেন।
মাশহাদে চিরনিদ্রায় প্রতিরোধ-সেনাপতি: ইরাকের বিদায় পর্ব শেষে শহীদদের মরদেহ বিমানে করে মাশহাদের শহীদ হাশেমিনেজাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরিয়ে আনা হয়। ইমাম রেজা মাজারের আজাদি ও ইনকিলাব চত্বরগুলো প্রয়াত নেতার বিশাল সব প্রতিকৃতিতে সাজানো হয়েছিল।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই চিরবিদায়ের দিনে ইরানি জাতি তাদের গভীর শোককে এক নতুন প্রতিজ্ঞায় রূপান্তর করেছে। দাফন শেষ করে দেশটির সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন যৌথভাবে অঙ্গীকার করেছে, প্রয়াত নেতার দেখিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং আপসহীন প্রতিরোধের পথ থেকে ইরান এক চুলও বিচ্যুত হবে না। সেই সঙ্গে তাঁকে হত্যার প্রতিশোধের জন্যও শপথ নেন ইরানিনা।
তথ্যসূত্র: তাসনিম নিউজ-তেহরান টাইমস