ইরানি হামলায় জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, জর্ডানে ইরানি হামলায় তাদের দুজন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের টানা সপ্তম রাতের বিমান হামলার জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ উসকে দেয়ার  জন্য আমেরিকাকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবারের ওই হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। এই নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে মোট ১৬ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত এবং ৪২০ জনেরও বেশি আহত হলেন। এই ঘটনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক মাধ্যম এক্সে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, তাদের এই আত্মত্যাগ আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।

জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) শনিবার কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ব্যাপক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্কিন হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আমেরিকার বারবার চুক্তি লঙ্ঘন প্রমাণ করেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইরানি জাতি ও তাদের প্রতিরোধ ফ্রন্ট শত্রুদের এমন শিক্ষা দেবে যা তারা কোনোদিন ভুলবে না।

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিও থেকে নেওয়া এই স্থিরচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ১৮ জুলাই কুয়েতের মাঙ্গাফে অবস্থিত একটি তেল স্থাপনার কাছে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে ছবি: সংগৃহীত
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের চতুর্মুখী হামলা

কুয়েত: কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বেশ কিছু ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানর অবস্থিত মার্কিন সামরিক সহায়তা কেন্দ্র এবং আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটির একটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করেছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন নিশ্চিত করেছে, উপর্যুপরি ইরানি হামলায় তাদের একটি তেল শোধনাগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জর্ডান ও বাহরাইন: জর্ডানের আল আজরাক মার্কিন ঘাঁটিতে শনিবার ভোরে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে অন্তত দুটি মার্কিন ফাইটার জেটসহ পাঁচটি বিমান ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান। এছাড়া বাহরাইনের 'শেখ ঈসা' বিমান ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধবিমান ও একটি গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্র লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে।

সৌদি আরব: দীর্ঘ তিন মাস পর সৌদি আরবের আকাশসীমায় ইরানি মিসাইল প্রবেশ করায় শনিবার ভোরে দেশটির আল-খারজ এবং ইয়ানবু এলাকায় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়। আল-খারজে মার্কিন সেনা ঘাঁটি এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবুতে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে ১৮ জুলাই কুয়েতের আহমাদি গভর্নরেটের একটি তেল স্থাপনার কাছে ধোঁয়া উড়ছে ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালী দখলের যুদ্ধ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব

সেন্টকম জানিয়েছে, তারা গত সাত দিন ধরে ইরানের নজরদারি চৌকি, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে উপর্যুপরি হামলা চালাচ্ছে। শনিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে মার্কিন বিমান হামলায় ৩ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত তিন সপ্তাহে মার্কিন হামলায় দেশে ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, আমেরিকা বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণকারী গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিজেদের দখলে নিতে চাইছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে আমেরিকা নৌ-অবরোধ জারি করেছে এবং ইরানও তাদের নিয়ম অমান্যকারী জাহাজগুলোর ওপর পাল্টা চড়াও হচ্ছে। ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির এই আশঙ্কা আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান পার্টির ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স