মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তির আশার আলো দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন যে, বিগত দুই-তিন দিনের ঘটনাবলী ও কূটনৈতিক বার্তা পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে দুই পক্ষ একটি শান্তি ব্যবস্থা বা চুক্তির বেশ কাছাকাছি পৌঁছেছে।
একই সাথে অপর অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত উন্নত ও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার মাধ্যমে যে বিধ্বংসী যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তাতে ইরান ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তু ও অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালায়।
বিশ্বজুড়ে সরবরাহকৃত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার এই ইতিবাচক খবরের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, যদিও সামগ্রিকভাবে তা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখনো অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে।
কূটনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে দুই দেশের মূল দাবি এবং শর্ত নিয়ে টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তেহরানে পাকিস্তানি অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী মহসিন নকভির সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং এর আগে জানান যে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সরাসরি কোনো বৈঠক না হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
ইরান ওমানের সাথে প্রণালীর নতুন নৌপথ নির্ধারণে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে থাকলেও তেহরানের স্পষ্ট বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জুনের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক হুমকি বন্ধ এবং ক্ষতিপূরণের শর্ত মানতে হবে। এর বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিগত ৫০ বছরে মার্কিন সেনা ও নাগরিকদের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরানের কাছে উল্টো বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করে বসেন, যা আলোচনার প্রক্রিয়াকে কিছুটা স্থবির করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে ট্রাম্পের ওপর ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেলেও এবং তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও, মাসব্যাপী সামরিক অভিযান চালিয়েও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ওপর আধিপত্য খর্ব করা সম্ভব হয়নি।
সমঝোতা বার্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক জলসীমায় নতুন করে নৌযানে হামলার ঘটনায় সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে মিশরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ নামক একটি ছোট কার্গো জাহাজে সম্ভাব্য হুতি হামলায় চারজন ক্রু সদস্য নিহত হন, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতি হামলায় প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
এর পাশাপাশি ওমান উপসাগরে পাকিস্তান উপকূলে মার্কিন সামরিক ব্লকেড অমান্য করায় তাদের একটি হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে একটি কন্টেইনার জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এপ্রিলে ঘোষিত এবং জুলাইয়ে পুনরায় কার্যকর করা মার্কিন অবরোধের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিরাও লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ফলে একদিকে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি চুক্তির আশা জাগলেও, অন্যদিকে জলপথে অব্যাহত সামরিক সঘাত পরিস্থিতিকে এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অনিশ্চিত করে রেখেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স