ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই। দেশটির নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাথে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে তেহরান যখন দর কষাকষির মাধ্যম হিসেবে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালী’ ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন এই পরিবর্তনের সূচনা হলো।
মহসেন রেজাই স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরের, যাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা পদে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগে গত মার্চ মাসে মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় পদটিতে থাকা আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর শূন্যতা তৈরি হয়।

৭১ বছর বয়সী মহসেন রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর আইআরজিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই মেয়াদেই ঘটেছিল ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, যা ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ নামে পরিচিত।
পরবর্তীতে তিনি ইরানের এক্সপিডিয়েন্সি ডিসার্সমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই পরিষদটি মূলতঃ পার্লামেন্ট এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে আইনি কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা সমাধান করে। উল্লেখ্য, গার্ডিয়ান কাউন্সিল হলো সর্বোচ্চ নেতা কর্তৃক মনোনীত এমন একটি পৃথক সংস্থা, যা পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্সি ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে এবং সব আইন সংবিধান ও ইসলামী বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কি না তা পরীক্ষা করে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ব্যাপারে রেজাই সবসময়ই জোরালো ভূমিকা রেখে এসেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা ডজন ডজন পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি মূল্যবান। এমনকি গত সপ্তাহেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখলে তাদের গুরুতর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক যাতায়াত বন্ধ করে, আর পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে।

তাঁর এই নিয়োগ সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
আল জাজিরা অ্যারাবিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেজেস্কিয়ানের কার্যালয় গত রোববার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান কর্তৃক মহসেন রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানায়।
একই দিনে সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে রেজাইকে কাউন্সিলে তাঁর নিজস্ব প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। সেখানে রেজাইয়ের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুগের অন্যতম পথপ্রদর্শক’ হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, যা মূলতঃ এই পদে এক সামরিক ব্যক্তিত্বকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ হিসেবে প্রতিফলিত হয়।
এই নিয়োগের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল হলো ইরানের এমন এক কেন্দ্রবিন্দু যেখানে প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগুলো একসাথে মিলিত হয়। ফলে, এই কাউন্সিলের সচিবের ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে যখন চলমান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্থবির আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালীতে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন এই পদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ।

তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আব্বাস আসলানি আল জাজিরাকে জানান, রেজাই এই পদে তাঁর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটাবেন। তিনি বলেন, সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিভাগ ও শক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারে, এমন কাউকেই তাদের প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও যোগ করেন, রাজনীতি ও নিরাপত্তার বিচারে তিনি তাঁর পূর্বসূরির চেয়ে খুব বেশি আলাদা না হলেও, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। সাবেক আইআরজিসি প্রধান ও এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য দর কষাকষিতেও রেজাইয়ের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রেজাই বর্তমান স্পিকার ও মার্কিন আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে সমর্থন করেছিলেন। এতে দেখা যায়, তিনি নির্বাচনে কট্টরপন্থী সাইদ জলিলির চেয়ে গালিবাফের রক্ষণশীল ধারার বেশি কাছাকাছি ছিলেন।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে রেজাই একজন উদারপন্থী বা নরম মেজাজের নেতা। তবে এটি প্রমাণ করে যে রক্ষণশীল শিবিরের ভেতরে থেকেও তিনি জলিলির মতো মার্কিন-আলোচনার ঘোর বিরোধী তীব্র কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর সাথে পুরোপুরি একসূত্রে বাঁধা নন। এই অবস্থান তাঁকে তিনটি ভিন্ন শিবিরের সাথে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করার নমনীয়তা দেবে: পেজেস্কিয়ানের তুলনামূলক আলোচনার পক্ষে থাকা সরকার, গালিবাফের মধ্যপন্থী-রক্ষণশীল গোষ্ঠী, এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী।

নিরাপত্তা নীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
আল জাজিরা অ্যারাবিকের মুখোমুখি হওয়া বিশ্লেষকরা এই নিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান দিক তুলে ধরেছেন:
১. ঘরোয়া রাজনৈতিক সুরক্ষাবর্ম এবং আলোচনার সম্ভাবনা। ইরানি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসাল্লাহ শামসোলভায়েজিন মনে করেন, রেজাইয়ের কঠোর সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ড মূলতঃ যে কোনো আলোচনার সিদ্ধান্তকে ঘরের মাঠে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা থেকে রক্ষা করবে।
ইরানে যেকোনো সমঝোতার বার্তা এলেই চরমপন্থীরা নমনীয়তার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু মহসেন রেজাইয়ের মতো একজন প্রভাবশালী সাবেক আইআরজিসি কমান্ডারের হাত ধরে কোনো চুক্তি বা আলোচনা এলে, দেশের ভেতরের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাঁকে ‘দুর্বলতা’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উপস্থিতি উল্টো এক বড় রাজনৈতিক নিশ্চয়তা দেবে।
২. সামরিক কৌশল ও আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ নীতি: অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মহসেন ফারখানি একে ইরানের নিরাপত্তা নীতির এক চরম কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, জুন মাসের সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বারবার লঙ্ঘিত হওয়ার পর এবং কূটনীতি ব্যর্থ হওয়ায় তেহরান এখন দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সংঘাত ও ‘শাস্তিমূলক আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ’ নীতির দিকে ঝুঁকছে। সাবেক আইআরজিসি প্রধান হিসেবে রেজাইয়ের যুদ্ধ পরিচালনা এবং বাহিনী সংগঠিত করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে ইরান এখন আর আগের মতো আলোচনায় নমনীয়তা দেখাবে না, বরং হরমুজ প্রণালী ও অন্যান্য ইস্যুতে শক্ত সামরিক অবস্থান নেবে।
সারসংক্ষেপ: চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, অধ্যাপক ফারখানি এই নিয়োগকে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকারকে ওপরে তুলে ধরে অবস্থান আরও কঠোর করার সংকেত হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, সাংবাদিক শামসোলভায়েজিনের মতে, সাবেক এই আইআরজিসি প্রধানের শক্ত সামরিক ভাবমূর্তিই হয়তো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো জটিল চুক্তিতে পৌঁছালে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
